ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

গ্রামে প্রতি তিন কিশোরীর দুজন মাসিকজনিত সমস্যায় ভোগে

গ্রামে প্রতি তিন কিশোরীর দুজন  মাসিকজনিত সমস্যায় ভোগে
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৯:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতি তিনজনের দুজন কিশোরী মাসিকসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। অনেকের ক্ষেত্রে তীব্র ব্যথার কারণে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি স্কুলেও যেতে পারছে না। একই সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (এসআরএইচআর) বিষয়ে জ্ঞানের বড় ধরনের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কানাডা ক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পরে গণমাধ্যমে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির দিয়ে এই তথ্য জানায় আইসিডিডিআর,বি।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায় অবস্থিত আইসিডিডিআর,বির বালিয়াকান্দি হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের (এইচডিএসএস) আওতাধীন ২ হাজার ৭১৩ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২৪ মাস ধরে চার মাস অন্তর তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণার এক অংশে ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১ হাজার ২৫৫ জন কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ কিশোরী অন্তত একটি মাসিকসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগেছে। সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে, মাসিকের তীব্র ব্যথা বা ডিসমেনোরিয়া, যা ছিল ৫৬ শতাংশ কিশোরীর মধ্যে। প্রতি তিনজন কিশোরীর মধ্যে একজন গবেষণাকালীন অন্তত তিনবার তীব্র মাসিক ব্যথার শিকার হয়েছে। ৯ শতাংশ কিশোরী নিয়মিতভাবে এ সমস্যায় ভুগেছে।

প্রায় ৪০ শতাংশ কিশোরী জানিয়েছে, মাসিকের ব্যথা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রভাব ফেলেছে। প্রতি চারজনের মধ্যে প্রায় একজন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা তীব্র ব্যথার কারণে স্কুলে যেতে পারেনি। নিয়মিত মাসিক ব্যথায় ভোগা মেয়েদের ৪৩ শতাংশের মধ্যে অন্যান্য শারীরিক জটিলতাও দেখা গেছে।
বালিয়াকান্দি ও রাজবাড়ীর ১ হাজার ৭৭ জন ১৬ বছর বয়সী অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীর ওপর পরিচালিত পৃথক এক বিশ্লেষণে প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি প্রকাশ পেয়েছে। 
গবেষণায় দেখা যায়, ৩৪ শতাংশ কিশোর জানত না যে ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর একজন মেয়ে গর্ভধারণ করতে পারে। কিশোরীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১৬ শতাংশ। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কেও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। ৮৪ শতাংশ কিশোর কনডম সম্পর্কে জানলেও কিশোরীদের মধ্যে এ হার ছিল মাত্র ৪৫ শতাংশ। একইভাবে জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সম্পর্কে ৩৮ শতাংশ কিশোরের ধারণা থাকলেও কিশোরীদের মধ্যে তা ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বিয়ের আগে পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা থাকা মেয়েদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। যেসব মেয়ের পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে জ্ঞান ছিল, তাদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার ছিল ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, এ বিষয়ে ধারণা না থাকা মেয়েদের ক্ষেত্রে হার ছিল ১০ শতাংশ।
গবেষণা পর্যবেক্ষণকালে প্রায় ২০০ কিশোরীর বিয়ে হয়েছে এবং ৭২ জন অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, বিয়ের আগেই সঠিক প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
অনুষ্ঠানে কিশোর-কিশোরীদের কাছে নির্ভরযোগ্য প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য পৌঁছে দিতে অ্যাডসার্চের দুটি উদ্ভাবনী উদ্যোগও তুলে ধরা হয়। এর একটি চাঁদপুরের মতলবে পরিচালিত স্মার্টফোনভিত্তিক শিক্ষা প্রকল্প, যা ৮৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর কাছে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। 

অন্যটি হলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যের বাংলা মোবাইল অ্যাপ ‘কৈশোর কথা’। অ্যাপটিতে অ্যানিমেটেড ভিডিও, ইনফোগ্রাফিকস এবং বিভিন্ন প্রচলিত ভুল ধারণার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ড. ফাওজিয়া আখতার হুদার সঞ্চালনায় আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা মাসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান মাসিক নিয়ে সমাজে প্রচলিত লোকলজ্জা ও কুসংস্কার দূর করার আহ্বান জানান, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকারবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মো. নুরুদ্দীন স্কুলভিত্তিক সচেতনতা, মেয়েদের শিক্ষা এবং কিশোর-কিশোরীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের ওপর জোর দেন।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এমসিএইচ সার্ভিস ইউনিটের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মনজুর হোসেন বলেন, পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক তথ্য মেয়েদের কাছে বিয়ের আগেই পৌঁছাতে হবে। তিনি জানান, প্রাক্-বৈবাহিক কাউন্সেলিং কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্কুল হেলথ শাখার সহকারী পরিচালক ডা. আসিফ ইকবাল কিশোর-কিশোরীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সরকারের চলমান উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি এডওয়ার্ড ক্যাব্রেরা কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার নিশ্চিত করতে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার চলমান সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন

×