ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

মিরপুরের বাংলাদেশ আই হাসপাতাল

নিবন্ধন নবায়নের প্রয়োজন মনে করে না হাসপাতালটি

নিবন্ধন নবায়নের প্রয়োজন মনে করে না হাসপাতালটি
×

 তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৮

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ। তবু প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধন নবায়নের প্রয়োজন মনে করেনি। পরিবেশ ছাড়পত্রের মেয়াদও শেষ গত বছরের ৩০ জুন, সেটারও নবায়ন হয়নি। এ রকম বেশ কিছু অনিয়মের ওপর ভর করে চিকিৎসা কার্যক্রম চালাচ্ছে বাংলাদেশ আই হাসপাতাল মিরপুর শাখা। হাসপাতালটির নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এসব অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে।

হাসপাতালটিতে চোখের অস্ত্রোপচারের সময় ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও রোগী অজ্ঞানের জন্য ছয় ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এসব ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে প্রায় সাত বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও হাসপাতালটি এ ধরনের কোনো নিবন্ধন নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। 

স্বাস্থ্য সেবা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রিত ওষুধের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকলে তা আইনি ও রোগী নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সাধারণত এসব ওষুধ ব্যবহার করলে অনেক সময় রোগীর জ্ঞান ফিরতে দেরি হয়। তখন আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া লাগে। যেহেতু এই হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নেই, তাই এসব ওষুধ ব্যবহার বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিবন্ধন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং নিয়ন্ত্রিত ওষুধ ব্যবহারের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এসবের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হলে তা নিয়ম লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে। 

কয়েকজন রোগী দাবি করেছেন, অস্ত্রোপচারের প্যাকেজের নামে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। ওটি চার্জ, সিট ভাড়া ও ওষুধের খরচের পাশাপাশি বিভিন্ন সার্ভিস চার্জের নামে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া প্যাকেজের মধ্যে লেন্সের দাম আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয় না, ফলে রোগীকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। 

বাংলাদেশ আই হাসপাতালের ১১টি শাখা রয়েছে। সাত বছর আগে মিরপুর-২-এর সুমি টাওয়ারে চারটি তলা ভাড়া নিয়ে শাখাটির কার্যক্রম শুরু হয়। গত বুধবার ওই হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সুমি টাওয়ারের তৃতীয় তলায় অভ্যর্থনা ডেস্কের পাশে হাসপাতালের লাইসেন্স-সংক্রান্ত কাগজ টাঙানো রয়েছে। সেখানে নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ হিসেবে ৩০ জুন ২০২৫ উল্লেখ রয়েছে। তবে নোটিশ বোর্ডে লেন্সের মূল্য তালিকা দেখা যায়নি, যদিও এটি প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। অস্ত্রোপচার প্যাকেজের খরচের তালিকায়ও লেন্সের মূল্য আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। জানতে চাইলে অভ্যর্থনা ডেস্কে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলেন, এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালভেদে চোখের অস্ত্রোপচারে ৩০ হাজার থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। তবে রোগীর দেওয়া বিলে লেন্সের দাম আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয় না। অথচ ঔষধ প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী, রোগীকে লেন্সের নাম, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য এবং উৎপাদনকারী দেশের তথ্য উল্লেখ করে রসিদ দিতে হয়। এ ছাড়া ফ্যাকো সার্জারির পর রোগীকে লেন্সের প্যাকেট সরবরাহ করারও নিয়ম রয়েছে।

সমকালের হাতে আসা নথি বলছে, ১৪ জুন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মুসাইফা নামে এক রোগীর চোখের অশ্রুনালিতে অস্ত্রোপচার করা হয়। সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের সময় জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এসব ওষুধ ব্যবহারের নিবন্ধন হাসপাতালটির নেই।

এ ছাড়া গত শুক্রবার আব্দুস সামাদের ইভিসেরেশনসহ পিএমএমএ বল ইমপ্লান্ট স্থাপনের অস্ত্রোপচার করা হয়। সেখানেও ওই অস্ত্রোপচারে জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। আব্দুস সামাদ বলেন, অস্ত্রোপচারের আগে কত টাকা খরচ হবে বা কোন খাতে কত টাকা লাগবে, সে বিষয়ে আমাদের স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ আই হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাকিয়া ওয়াদুদ বলেন, নিবন্ধনের বিষয়ে গভর্নিং বডির সঙ্গে কথা বলুন। আবেদন করছেন কিনা– জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনি অফিসে যোগাযোগ করুন।

প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার ডা. কাজী মেজবাহুল আলম বলেন, নিবন্ধন নবায়নের বিষয়টি খোঁজ নিচ্ছি। যেসব ওষুধ ব্যবহারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিবন্ধন প্রয়োজন, সেসব ওষুধ আমরা ব্যবহার করি না। যদিও প্রতিদিন এই ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে– এমন নথি সমকালের হাতে রয়েছে।

হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. নিয়াজ আবদুর রহমানের সঙ্গে গত শনিবার কথা বলেছে সমকাল। তিনি দাবি করেন, দেশের অনেক বেসরকারি হাসপাতাল এভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। আমরা নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছি। তবে সমকাল খোঁজ নিয়ে দেখেছে, গত শনিবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এ ধরনের কোনো আবেদন জমা পড়েনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মঈনুল আহসান বলেন, নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া হাসপাতাল পরিচালনার সুযোগ নেই। তথ্য যাচাই করে আমরা আইনি ব্যবস্থা নেব।

আরও পড়ুন

×