ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

ঢাকার অনুরোধে তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতা করবে চীন: ইয়াও ওয়েন

ঢাকার অনুরোধে তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতা করবে চীন: ইয়াও ওয়েন
×

রাজধানীর বারিধারায় সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। ছবি: ফোকাস বাংলা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ২২:৫৬ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ | ২৩:০৩

ঢাকার অনুরোধে উত্তরাঞ্চলের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে যথাসাধ্য সহযোগিতা করবে বেইজিং বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, প্রকল্পটির সঙ্গে নদীর আশপাশের মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই, বৃহদায়তন এই প্রকল্পে এগিয়ে এসেছে চীন।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বারিধারায় চীনের দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত চীন সফর নিয়ে চীন দূতাবাস এক ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে। শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের বিষয়ে তুলে ধরেন ইয়াও ওয়েন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘এর আগের সমঝোতা স্মারকটি হয়েছিল চীনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু এখন আমরা এই প্রকল্পে সরকারি স্তরে সহযোগিতার কথা বলছি। চীনা প্রতিষ্ঠান নিজেদের সমীক্ষা চালাতে পারে। আমরা সেরা বিজ্ঞানীদের দিয়ে সমীক্ষা চালাব। প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে হলে অবশ্যই সমীক্ষার প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এই প্রক্রিয়ায় চীন সরকার কাজ করে সমীক্ষা এগিয়ে নেবে। এ ব্যাপারে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’

তিস্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ এবং উজান থেকে ভারত পানি না ছাড়লে এটি ফলপ্রসূ হবে কি না- এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এটা নিয়ে অন্য উপাদানের কথা বলছেন। এটা আমাদের বিবেচনার বিষয় নয়। বাংলাদেশের প্রত্যাশা অনুযায়ী চীন এগিয়ে এসেছে।’

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডরের বিষয়ে জানতে চাইলে ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘এটি নতুন উদ্যোগ নয়। আমরা ১৫ বছর আগে বিসিআইএমের (বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর) প্রস্তাব করেছিলাম। কিছু অগ্রগতি হলেও চীন যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবে তা এগোয়নি। যেহেতু বাংলাদেশ আঞ্চলিক সংযুক্তি চাইছে; চীনও আরও বেশি আঞ্চলিক সংযুক্তি চায়। আমি বিশ্বাস করি, মিয়ানমারও এ ধরনের সহযোগিতা চায়।’

সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ছিল— তারেক রহমানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর, স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ চীন প্রত্যাখ্যান করবে। আপনি কি এটি ব্যাখ্যা করতে পারেন? এমন প্রশ্নের জবাবে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়, আমাদের বৈদেশিক নীতি হলো—চীন যেকোনো দেশে যে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। চীন নিজেও একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। অনেক বিদেশি অপশক্তি চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায়। এমনকি এখনও আমরা কিছু মহলের দ্বারা একই ধরনের অপচেষ্টার সম্মুখীন হচ্ছি। আপনাদের এটি বুঝতে হবে। তাই, বাংলাদেশ বর্তমানে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, তা আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারি।

তিনি আরও বলেন, কাজেই বাংলাদেশের কাছে এই বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে চীন বাংলাদেশের পাশে আছে। গত ৫০ বছর ধরে এটাই আমাদের নীতি।

চীনা রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘অন্য দেশের ব্যাপারে আমরা খোলামন নিয়ে আছি। তারা যদি তৈরি থাকে, তবে আমরা তাদের যুক্ত করতে তৈরি আছি। এটা তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু চীন এখন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে অর্থনৈতিক করিডর এগিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতার কারণে স্থলপথে করিডর প্রতিষ্ঠার সমস্যা নিয়ে জানতে চাইলে ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা বন্দর ও সমুদ্রপথে যুক্ততার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে পারি।’

কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কৌশলকে আরো বিন্যস্ত করতে চায় ঢাকা-বেইজিং জানিয়ে ইয়াও ওয়েন বলেন, সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই সম্পর্ক ২০টির বেশি দেশের সঙ্গে চীনের রয়েছে। এই তালিকায় পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ এলো। চীন-বাংলাদেশ সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার যাত্রায় কূটনীতি ও প্রতিরক্ষাখাতে সমন্বয় সাধনের জন্য নতুন ‘প্ল্যাটফর্ম’ গঠনের আলোচনা চলার কথা বলেছেন তিনি।

রাষ্ট্রদূত বলেন, এখন আমরা ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের লক্ষ্যে চীন-বাংলাদেশ কমিউনিউটি’। এটা সহযোগিতার নতুন সংজ্ঞায়ন। তার মানে হচ্ছে, সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতা। সুতরাং এই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতার সমর্থনে আমাদের কিছু ব্যবস্থাপনা দরকার।

তিনি বলেন, সেই ব্যবস্থাপনা তৈরির জন্য ‘রাজনৈতিক পর্যায় থেকে’ দুটি নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের কথা এসেছে দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে। একটি হলো, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কৌশলগত সংলাপ। আরেকটি কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাত মিলিয়ে ‘টু প্ল্যাস টু’ আলোচনার প্ল্যাটফর্ম অনুসন্ধান।

জাতিসংঘের পরবর্তী অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কথা তুলে ধরে ইয়াও ওয়েন বলেন, তার মানে হচ্ছে, দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর কৌশলগত দিক নিয়ে আরও বেশি করে আলাপ করবেন।

অন্য প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘টু প্লাস টু’র মানে হচ্ছে, চীন শুধু রাজনৈতিক আলোচনা ও সংলাপ করবে না, বিস্তৃত প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও আমাদের রয়েছে। সুতরাং এই প্ল্যাটফর্মের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা খাতকে উভয় দেশ কীভাবে দেখে, সেটার আরও সমন্বয় সাধন হবে। এর মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে আমাদের কৌশলগত যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বাড়বে। কোন পর্যায়ে এবং কীভাবে ‘টু প্লাস টু’ হবে, তা নিয়ে আলোচনা সামনের দিনে চলার কথা বলেন ইয়াও ওয়েন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে ‘টু প্লাস টু’ থাকার তথ্য দেন রাষ্ট্রদূত। এর মধ্যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ে ‘টু প্লাস টু’ আলোচনা করে থাকে চীন।

এমন প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের দিক থেকে প্রথম না হওয়ার কথা তুলে ধরে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে তুরস্কের সঙ্গে মন্ত্রী পর্যায়ে ‘টু প্লাস টু’ করার ঘোষণা এসেছে। সুতরাং চীন প্রথম নয়। আর এটির ঘোষণা এসেছে বেইজিং ও ঢাকার উভয়ের পরামর্শে।

প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের বেইজিং সফরে দু’দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘চায়না-বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ শেয়ার্ড ফিউচার’ হিসাবে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনার ক্ষেত্রে এটি চীনের সর্বোচ্চ পর্যায়। এক প্রশ্নে রাষ্ট্রদূত ইয়াও বলেন, সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই সম্পর্ক ২০টির বেশি দেশের সঙ্গে রয়েছে চীনের। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ এলো এই তালিকায়।

জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনা প্রসঙ্গে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে বেইজিং থেকে বাংলাদেশের জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর হয়েছে। এ বিষয়ে এক প্রশ্নে কোনো মন্তব্য না থাকার কথা বলেছেন ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, আপনি নিশ্চয় দেখেছেন, যৌথ বিবৃতিতে উভয় দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে আলোচনা, সফর ও প্রশিক্ষণ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রেও একমত হয়েছে। সুতরাং, আমি যেভাবে বলেছি, আমাদের সহযোগিতা খুবই সমন্বিত। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা তারই অংশ। কোনো নির্দিষ্ট কেনাকাটার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার মতো অবস্থানে আমি নেই। সুতরাং, আমি কোনো মন্তব্য করার মতো অবস্থানে নেই।’ 

সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার ধারাবাহিকতায় প্রতিরক্ষাসহ সবক্ষেত্রে সহযোগিতা সামনের দিনে আরও বাড়ার কথা বলেন ইয়াও ওয়েন।

আরও পড়ুন

×