সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুদান বণ্টন নিয়ে প্রশ্নের মুখে নীতিমালা ও স্বচ্ছতা
৩৬ হাজার ৫০০ টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছে আরণ্যক, ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পাওয়া নিয়ে বিতর্কে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন
আরণ্যকের ‘রাঢ়াঙ’ নাটকের দৃশ্য। ছবি:সংগৃহীত
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ২১:০১
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অনুদান বণ্টন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রাচীন নাট্যদল আরণ্যক পেয়েছে মাত্র ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নের মুখে থাকা বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পেয়েছে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
অনুদান বণ্টনের এই বৈষম্য নিয়ে নাট্যজন, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও শিল্পীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় অর্থ বণ্টনে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। অনেক সক্রিয় ও দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সংগঠন নামমাত্র অনুদান পেয়েছে, আবার অনেক সংগঠন কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
এরই মধ্যে আরণ্যক ও জাতীয় কবিতা পরিষদ অনুদান প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে। কয়েকটি সংগঠন অনুদানের তালিকা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অনুদান নীতিমালার দাবি জোরালো হয়েছে।
তবে সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেছেন, অনুদান বণ্টন নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শিল্পকলা শাখার প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার ১৯৪টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে মোট ১ কোটি ৪৬ লাখ ১৪ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পেয়েছে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন। বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা পেয়েছে ১২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার পেয়েছে ৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আইটিআই) বাংলাদেশ ও রাধারমন সংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র পেয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে।
অন্যদিকে দেশের পরিচিত নাট্যদলগুলোর একটি বড় অংশ পেয়েছে এক লাখ টাকার কম অনুদান। দেশ নাটক, স্বপ্নদল, বাংলাদেশ থিয়েটার ও নাট্যতীর্থ পেয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা করে। ঢাকা পদাতিকসহ কয়েকটি সংগঠনের অনুদান ৫৯ হাজার টাকা। থিয়েটার আর্ট ইউনিট, জাগো আর্ট সেন্টারসহ ৩৭টি সংগঠন পেয়েছে ৬৯ হাজার টাকা করে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে আরণ্যকসহ ৬২টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য মাত্র ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দকে কেন্দ্র করে।
অনুদান ফিরিয়ে দিচ্ছে আরণ্যক
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত আরণ্যক নাট্যদল অনুদান গ্রহণে অপারগতার কথা জানিয়ে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে প্রতিষ্ঠাতা মামুনুর রশীদ ও প্রধান সম্পাদক হারুন রশীদ উল্লেখ করেন, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় নাট্য আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একটি দলকে নবীন সংগঠনের কাতারে ফেলে নামমাত্র অনুদান দেওয়া হয়েছে, যা তাদের অবদানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
তারা বলেন, রাষ্ট্রীয় অনুদান শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, এটি শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি রাষ্ট্রের মূল্যায়নেরও প্রতিফলন। তাই অনুদান প্রদানের নীতিমালা, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও মানদণ্ড পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নাট্যনির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার বলেন, ‘আরণ্যকের মতো একটি দল পেয়েছে মাত্র ৩৬ হাজার টাকা। অথচ অনেক কার্যক্রমহীন দল লাখ টাকার বেশি অনুদান পেয়েছে। গত এক বছরে যাদের কোনো কার্যক্রম নেই, তারাও অনুদান পেয়েছে। তারা কীভাবে এই বরাদ্দ পেল, সেটিই প্রশ্ন।’
বাদ পড়েছে বহু সংগঠন
শুধু কম অনুদান নয়, বরাদ্দ তালিকা থেকেই বাদ পড়েছে বহু সাংস্কৃতিক সংগঠন। বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট বলেন, তাদের সংগঠনসহ অন্তত ১৭টি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কোনো কারণ না জানিয়েই অনুদান তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শুধু আমাদের নয়, সারা দেশে আরও অনেক সংগঠন এবার অনুদান পায়নি। কেন বাদ দেওয়া হলো, তার কোনো লিখিত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি।’
অনুদান না পাওয়া সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়, উঠোন, নৃত্যাঙ্গন, মিরপুর সাংস্কৃতিক একাডেমি, স্বাত্বিক নাট্য সম্প্রদায় ও কাব্য বর্ষণ।
নাট্যদল অনুস্বরের প্রধান মোহাম্মদ বারী বলেন, ছয় বছরে ১২টি নাটক মঞ্চস্থ করার পরও তাদের সংগঠনের নাম তালিকায় নেই। তিনি বরাদ্দ পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
থিয়েটার ফ্যাক্টরির প্রধান অলোক বসু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ভুল হতে পারে। কিন্তু ভুল আঁকড়ে থাকা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করা কখনোই মঙ্গল বয়ে আনে না।’
ফেডারেশনের অনুদান নিয়েও বিতর্ক
সবচেয়ে বেশি অনুদান পাওয়া বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফেডারেশনের সাবেক চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ গত ২৫ জুন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক চিঠিতে অভিযোগ করেন, সংগঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে একটি পক্ষ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে বর্তমান নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই অবস্থায় সরকারি অনুদান গ্রহণ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় কবিতা পরিষদও অনুদান প্রত্যাখ্যান করেছে
সংগঠনটির সভাপতি মোহন রায়হান বলেন, ১৯৮৭ সালে সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, মহাদেব সাহা ও ফয়েজ আহমেদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠনকে মাত্র ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা তাদের কাছে অবমাননাকর।
তিনি বলেন, ‘যোগ্য সংগঠন বাদ দিয়ে একটি চক্র নিজেদের পছন্দের সংগঠনকে অনুদান পাইয়ে দিয়েছে।’
তার মতে, ১৯৪টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য ১ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বরাদ্দও বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত অপ্রতুল। সংস্কৃতি খাতে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোরও দাবি জানান তিনি।
অনুদান পাওয়া ও না পাওয়া- উভয় পক্ষের সংগঠনের দাবির মূল সুর একটিই। রাষ্ট্রীয় অর্থ বণ্টনে স্বচ্ছ নীতিমালা, জবাবদিহিমূলক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং সংগঠনের কার্যক্রমভিত্তিক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
- বিষয় :
- সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়
- অনুদান
- বিতর্ক
- নীতিমালা