ঢাকার জলাবদ্ধতা
বর্ষা এলে প্রস্তুতি, নাকি প্রস্তুতির ভান?
ছবি: সমকাল
মো. আব্বাস
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ২২:৩০
ঢাকায় বর্ষা এখন আর শুধু একটি ঋতুর নাম নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সময়। আকাশে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি হলেই রাজধানীর অসংখ্য সড়ক নদীতে পরিণত হয়। হাঁটু, কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে যানবাহন, থেমে যায় অফিসগামী মানুষের পথচলা, ব্যবসায়ীদের দোকানে পানি ঢোকে, শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে পৌঁছাতে পারে না, অ্যাম্বুলেন্সও আটকে পড়ে জলাবদ্ধতায়। প্রতিবছর একই দৃশ্য। একই দুর্ভোগ। একই প্রতিশ্রুতি। শুধু ক্যালেন্ডারের বছর বদলায়, বাস্তবতা বদলায় না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট কোনো অপ্রত্যাশিত দুর্যোগ নয়। বরং এটি এমন একটি সমস্যা, যার কারণ আমরা জানি, সমাধানের পথও মোটামুটি জানা। তবু প্রতিবছর বর্ষা শুরু হওয়ার পরই যেন প্রশাসনের ঘুম ভাঙে। তখন শুরু হয় ড্রেন পরিষ্কার, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, খাল খননের ঘোষণা, পাম্প বসানোর উদ্যোগ। অথচ এসব প্রস্তুতি যদি শুষ্ক মৌসুমেই শেষ করা যেত, তাহলে হয়তো বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতেই নগরবাসীকে এমন অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবারও ২৯টি জলাবদ্ধতার হটস্পট চিহ্নিত করেছে। এই তালিকার অনেক এলাকাই নতুন নয়। ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, মালিবাগ, ফকিরাপুল, কমলাপুর, শান্তিবাগ কিংবা সায়েদাবাদ বছরের পর বছর একই তালিকায় ঘুরেফিরে আসে। প্রশ্ন হলো, যদি একই এলাকাগুলো প্রতিবছর জলাবদ্ধ হয়, তাহলে আগের বছরগুলোর প্রকল্প, সংস্কার কিংবা খোঁড়াখুঁড়ির ফলাফল কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বোঝা যায়, আমাদের বড় সমস্যা কাজের অভাব নয়, ধারাবাহিক পরিকল্পনার অভাব। আমরা সমস্যার শিকড়ে হাত না দিয়ে প্রতিবছর শুধু উপসর্গের চিকিৎসা করি। ড্রেন পরিষ্কার করি, কিন্তু ড্রেনে বর্জ্য পড়া বন্ধ করতে পারি না। খাল খনন করি, কিন্তু খাল দখল রোধ করতে পারি না। পাম্প বসাই, কিন্তু পানি বের হওয়ার পর্যাপ্ত আউটলেট তৈরি করতে পারি না। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা কেবল একটি ড্রেনেজ সমস্যা নয়। এটি অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ ধ্বংস, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল। একদিকে খাল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পানি ধারণের জায়গা কমে গেছে। অন্যদিকে কংক্রিটের নগর দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ কমেছে। তার ওপর অল্প সময়ের মধ্যে অতিবৃষ্টির প্রবণতা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও বেড়েছে। ফলে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই পুরো নগরের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হয়।
ডিএসসিসির উপস্থাপিত তথ্যও এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। গত কয়েক দশকে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত খুব বেশি না বাড়লেও স্বল্প সময়ে তীব্র বৃষ্টিপাতের ঘটনা বেড়েছে। অর্থাৎ আগের চেয়ে কম সময়ে বেশি পানি নামছে। কিন্তু সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের নগর অবকাঠামো পরিবর্তিত হয়নি। একটি দ্রুত বদলে যাওয়া জলবায়ুর জন্য একটি ধীরগতির নগর ব্যবস্থা কখনোই কার্যকর হতে পারে না।
তবে এটিও সত্য যে, জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছু ইতিবাচক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন আউটলেট নির্মাণ, খাল পুনরুদ্ধার, পাম্প স্টেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, রিটেইনিং ওয়াল, ওয়াকওয়ে, ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান, এমনকি দীর্ঘ মেয়াদে আরও আটটি নতুন আউটলেট নির্মাণের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের মধ্যে একটি দীর্ঘ ব্যবধান রয়েছে। প্রকল্প ঘোষণার চেয়ে প্রকল্প শেষ হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সমন্বয়ের অভাব। ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। এখানে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ওয়াসা, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় খুব কমই দেখা যায়। এক সংস্থা রাস্তা কাটে, আরেক সংস্থা কয়েক মাস পর আবার সেই একই রাস্তা কাটে। কোথাও ড্রেন নির্মাণ হয়, কিন্তু তার সঙ্গে সংযুক্ত খাল বা আউটলেটের কাজ শেষ হয় না। ফলে পুরো ব্যবস্থাটিই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ নাগরিক আচরণও। প্লাস্টিক, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য নির্বিচারে ড্রেনে ফেলার সংস্কৃতি আজও বদলায়নি। নিয়মিত পরিষ্কার করা হলেও কয়েক দিনের মধ্যে ড্রেন আবারও বর্জ্যে ভরে যায়। তাই শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, নাগরিক সচেতনতা ও কঠোর আইন প্রয়োগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবত চিন্তার জায়গায়। আমরা এখনও জলাবদ্ধতাকে মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখি। অথচ এটি একটি বছরব্যাপী নগর পরিকল্পনার বিষয়। বর্ষা শুরু হওয়ার আগে খাল পরিষ্কার, ড্রেন সংস্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আউটলেট উন্নয়ন এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়া উচিত। বর্ষার মধ্যে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করা মানে আগুন লাগার পর কূপ খোঁড়া।
ঢাকা এমন একটি শহর, যেখানে অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং প্রশাসনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রগুলো অবস্থিত। এই শহর কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে অচল হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু রাজধানী নয়, পুরো দেশ। উৎপাদনশীল সময় নষ্ট হয়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, মানুষের মানসিক চাপ বাড়ে। জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব খুব কমই সামনে আসে, অথচ এর প্রভাব হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
ঢাকাকে জলাবদ্ধতার এই চক্র থেকে বের করে আনতে হলে মৌসুমি উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সমন্বিত নগর পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। খাল উদ্ধার করতে হবে, জলাভূমি রক্ষা করতে হবে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে, নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে বাধ্যতামূলক ড্রেনেজ পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে এবং নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, বর্ষা এলেই কাজ শুরু করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
প্রতিবছর বৃষ্টি নামবে, এটি নিশ্চিত। কিন্তু প্রতিবছর একই দুর্ভোগ হবে, সেটি কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়। প্রশ্নটি এখন আর প্রকৃতির কাছে নয়, প্রশ্নটি আমাদের পরিকল্পনা, অগ্রাধিকার এবং দায়িত্ববোধের কাছে। যতদিন পর্যন্ত আমরা বর্ষাকে অবাক হওয়ার মতো ঘটনা ভেবে প্রস্তুতি নেব, ততদিন পর্যন্ত রাজধানীর মানুষকে একই জলাবদ্ধতার গল্প বারবার বাঁচতে হবে।
মো. আব্বাস: যোগাযোগ পেশায় কর্মরত
[email protected]