ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

অপরাধের বিচার বনাম রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিচার

অপরাধের বিচার বনাম রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিচার
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার পরই আলোচনাটি শুরু হয়; রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ কী উপায়ে হবে বা আদৌ তা সম্ভব কিনা? এর মধ্যে এনসিপিসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ঝটিকা আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। পদাধিকারী নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি দল হিসেবেও আওয়ামী লীগের গণবিরোধী ভূমিকার বিচার হবে বলে ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শেষে সংসদে দুটি অধিবেশন চলাকালে এ বিষয়ে আর আলোচনা হয়নি। কিন্তু শনিবার জুলাই জাতীয় সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে, তাদের দাফন হয়েছে দিল্লিতে। শিগগিরই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শুরু হবে।’ (সমকাল, ৫ জুলাই ২০২৬)। 

রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার প্রণীত আইনেই বিচারের মুখোমুখি হবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি। অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রসঙ্গটিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা জরুরি। 
আমরা জানি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিপুল প্রাণহানি ঘটেছিল। আহত মানুষের সারি, বহু মানুষের আত্মত্যাগ ছিল। এই ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচার প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই। আইনি প্রক্রিয়া চলমান। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ উচ্চপদস্থ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলার রায়ও ইতোমধ্যে ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের প্রক্রিয়া দেশের রাজনীতিতে নিশ্চয়ই প্রভাব ফেলবে।

আমাদের দেশে যে কোনো সরকার যাবতীয় সমস্যার দায় পূর্ববতী সরকারের ঘাড়ে চাপাতে সিদ্ধহস্ত। বর্তমান সরকারের পক্ষেও বিভিন্ন সমস্যার দায় আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলের কাঁধে হয়তো কিছুদিন চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণ বর্তমান ও পূর্বতন সরকারের তুলনা করতে শুরু করবে। যতই দল কিংবা দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হোক, বর্তমান সরকারের সুশাসন বা ব্যর্থতা আওয়ামী লীগকে আবার অপ্রাসঙ্গিক বা প্রাসঙ্গিক করে তুলবে। 
বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করবার মতো রাজনৈতিক সামর্থ্য, দক্ষতা, জনসমর্থন জামায়াত বা এনসিপির নেই– এ কথা বোধগম্য। তাই বিএনপি তার প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে মাঠে অনুপস্থিত রাখতে যে উদ্যোগই নিক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে না। মনে রাখতে হবে– আওয়ামী লীগ সরকার টানা তিন মেয়াদে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে দেশের মূল রাজনৈতিক স্রোত থেকে সরিয়ে দিতে খেয়ালখুশির নির্বাচন ও শাসন চালু করেছিল। এর ফলাফল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। 

২.
আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী শাসনে অতিষ্ঠ ও সংক্ষুব্ধ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও সংঘাতের মূল উচ্চারণ বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দলকে গভীরভাবে বুঝতে হবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল ব্যক্তির পরিবর্তনের জনআকাঙ্ক্ষামাত্র ছিল না। ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও আচরণে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছিল। সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রদত্ত জুলাই সনদ ছাড়া সংসদে আর কোনো সংস্কার প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা শুনি না। নারী অধিকারবিষয়ক সংস্কারসহ অধিকাংশ সংস্কার প্রতিবেদন নিয়ে সরকার বা বিরোধী দলের নীরবতায় বোঝা যায়, এসব বিষয়ে তারা মনোযোগী নয়।

রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেবার বন্দোবস্ত নিশ্চিত করবার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আলাপ তাই সব অংশীজনের পক্ষ থেকেই প্রয়োজন। সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদটি নিয়ে অন্তত বিরোধী দলের বক্তব্য জরুরি। এই আইনে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী ব্যক্তিস্বাধীনতা ও প্রাণের অধিকার রক্ষা হবে। ‘আইন অনুযায়ী’ শব্দদ্বয় দ্ব্যর্থক। রাষ্ট্র যখন কোনো দমনমূলক আইন চালু করে এবং সেই আইন সামনে রেখে হত্যা-নিষ্পেষণ চালায়, তখন সেটাকেও ‘আইনিভাবে অবৈধ’ বলা যায় না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকালে বিপুল প্রাণহানির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য সাংবিধানিক ঢাল হয়ে উঠেছিল এই আইন। এর পরিবর্তন না হওয়ার কারণ বোধগম্য নয়। বিভিন্ন দেশের সংবিধানে ‘শর্তহীনভাবে প্রাণের অধিকার সংরক্ষণ’ প্রতিষ্ঠিত; আমাদের সংবিধানেও ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে প্রাণের অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। 

৩.
আমরা বারবার বলতে চাই, কোনো সরকারই কেবল একটি দলের সরকার নয়। সরকার দল-মত নির্বিশেষে জনগণ তথা রাষ্ট্রের। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিশেষ কোনো দলকে টিকিয়ে রাখা বা ধ্বংস করবার দায়িত্ব নিতে পারে না। দল টিকে থাকবে অথবা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে কেবলমাত্র মানুষের রায়ে; নির্বাচনের মাধ্যমে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল আইনের শাসন নিশ্চিত করা। ব্যক্তির অপরাধ বিচারের এখতিয়ার কেবলমাত্র আদালতের। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোনোভাবেই অপরাধের বিচারে প্রভাব রাখতে পারবে না।

আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে হত্যাযজ্ঞের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু অপরাধ দল করে না; করে দল বা সরকারের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি। প্রতি ঘটনায় দায়ী প্রত্যেককে বিচারের মুখোমুখি করে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালে বিগত ৫৪ বছরে সরকারে থাকা সব রাজনৈতিক দল বা জোটের বিরুদ্ধেই নানা ঘটনায় একই ধরনের মামলা দেওয়া সম্ভব। ব্যক্তির দায় সংগঠনের ওপর চাপিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগীকে নিষিদ্ধ করবার পাঁয়তারা শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অন্তত চারটি নির্বাচন সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিকভাবে সম্পন্ন হয়। সব কয়টি নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলই কমবেশি ৪০ শতাংশ করে ভোট পায়। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর ভোট প্রদানের হার থেকে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগ দেশের মানুষের একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এদের অধিকাংশই সাধারণ সমর্থক; তারা দলের নেতৃত্ব নয়। গুম-খুন-দুঃশাসনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। কাজেই দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে শুধু প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে রাজনীতির বাইরে রাখার অপপ্রয়াস আখেরে উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে। যে দলের প্রতি নিপীড়ন চলে; সে দলের প্রতি জনসাধারণের সহানুভূতি বাড়ে বৈ কমে না। 

এ-ও সত্য, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মধ্যে নিজেদের দুষ্কর্ম নিয়ে অনুতাপ বা অনুশোচনার দেখা এখনও মেলেনি। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো অভিযোগেই তারা ‘ষড়যন্ত্র’ খুঁজে পান। নেতৃবৃন্দের আত্মম্ভরিতা ও অহমিকা এখনও স্পষ্ট। রাজনীতিতে অংশগ্রহণের প্রশ্নও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দুই বছরের মধ্যেও প্রকাশ্য কোনো পরিকল্পনা হাজির করতে পারেনি। অবশ্য এতে আওয়ামী লীগের বিচারের প্রশ্নে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রশ্নটি বাতিল হয়ে যায় না। 

আওয়ামী লীগের নেতারা তাদের কর্মফল আদালতে পাবেন। তবে দলটির ঘোষণাপত্র বা গঠনতন্ত্রে অপরাধের কোনো পরিকল্পনা নেই। কাজেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দলটিকে নিশ্চিহ্ন না করে ক্ষমতাসীনরা সুশাসন, জবাবদিহিতার এমন দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে পারেন, যাতে জনসাধারণই আওয়ামী লীগকে ত্যাগ করে উপযুক্ত দলকে সমর্থন জানাতে পারে। আর জনসাধারণের সামনে যত বেশি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল থাকে, গণতন্ত্রের ভিত তত সুশক্ত ও জনমুখী হয়ে ওঠে।

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×