উচ্চশিক্ষা
যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ‘উন্নয়ন ফাঁদ’
সাজ্জাদ সিদ্দিকী
সাজ্জাদ সিদ্দিকী
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৮ | আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিটি নির্বাচনী আসনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা শুধু আত্মঘাতী নয়, উচ্চশিক্ষার ন্যূনতম সক্ষমতা ও টেকসই উপযোগিতা-বিবর্জিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের এমন ‘উন্নয়ন বাতিক’ দেখা গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ইউনিয়ন পরিষদ বা শপিং মল নয় যে তা ভোটারের দুয়ারে পৌঁছে দিতে হবে। গুণগত মান ও সক্ষমতা বিচার না করে যত্রতত্র ক্যাম্পাস খোলার এই কাণ্ডজ্ঞানহীন জেদ দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বড় বিপর্যয় ও দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিগত সরকারের নেওয়া জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেশের বুদ্ধিজীবী ও অংশীজনদের তেমন সমালোচনা না থাকার পরিপ্রেক্ষিতেই হয়তো বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী এ ধরনের যুক্তি দিচ্ছেন। এভাবে ‘উন্নয়ন’ ন্যারেটিভের অন্যতম বড় শিকার হচ্ছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা।
দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে সীমানা প্রাচীরবেষ্টিত চটকদার বাহ্যিক রূপসমৃদ্ধ ভবন হয়তো আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করে; কিন্তু বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শিক্ষাকাঠামো প্রায় ফাঁপা। শিক্ষকদের মান, তাদের পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কিংবা শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের মানবিক দরদ ও মনোযোগের বিষয়গুলো অনুপস্থিত। ব্যক্তি উদ্যোগে যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে সরকারীকরণ ছিল ভোটের বিবেচনায় অপরিণামদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। একই চিত্র দেখা যায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক ক্ষেত্রেও। ফলে সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
একই চিত্র উচ্চশিক্ষাতেও দৃশ্যমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন কেবল একেকটি প্রাণহীন দালানের স্তূপে পরিণত হচ্ছে। নেই যুগের চাহিদা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম, নেই গবেষণার জন্য আধুনিক ল্যাবরেটরি– এমনকি লাইব্রেরির কার্যকর সুবিধা প্রদানে কার্পণ্য চোখে পড়ার মতো। শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষাপ্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী কাউকেই গুণগত মানদণ্ডের মুখোমুখি দাঁড় করানোর আগ্রহ নেই কর্তৃপক্ষের।

এর পাশাপাশি আরও একটি ভয়াবহ সংকটকে সরকার সচেতনভাবে লালন করছে। ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্ররাজনীতির নামে যে লেজুড়বৃত্তি ও চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে, তাকে নিয়ন্ত্রণে আনা কিংবা বিকল্প ব্যবস্থার কোনো সদিচ্ছাই কারোরই নেই। ধারাবাহিক এ অবহেলার চড়া মূল্য দিচ্ছে জাতি এবং ভবিষ্যতেও দিতে হবে। মেগা দুর্নীতির স্বার্থে শিক্ষাকে কেবল ‘অবকাঠামো’র ফ্রেমে বন্দি করে আমরা একটি মেধাহীন ও মেরুদণ্ডহীন প্রজন্ম তৈরি করছি। এই ধারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের কারণ। জাতি আশা করেছিল অন্ততপক্ষে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই সর্বনাশা রোগ থেকে মুক্ত হতে পারবে। দুঃখজনক হলো, ব্যাধিটি সংক্রামক এবং বর্তমান সরকারের মধ্যেও এই সস্তা জনপ্রিয়তা দেখা যাচ্ছে।
আমার আগের একটি লেখায় বলেছিলাম, র্যাঙ্কিংয়ের পেছনে না ছুটে প্রথমে বিশ্বমানের প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা জরুরি; যা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই র্যাঙ্কিংয়ের চাহিদা মেটাবে। আজকের লেখার মূল বিষয় হলো, কেন বাংলাদেশে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে না এবং কেন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন না করে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্য থেকে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর করা প্রয়োজন সে প্রসঙ্গ। এর জন্য সবচেয়ে জরুরি আত্মজিজ্ঞাসা এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ।
প্রথমত, কাঠামোগত সংকট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্ধ অনুকরণ। আমাদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বড় ট্র্যাজেডি হলো, এদের নিজস্ব কোনো রূপকল্প বা ভিশন নেই। দিনে দিনে নিজস্ব স্বকীয়তা ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ে গড়ে ওঠার বদলে দেশের প্রতিটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অন্ধভাবে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’কে অনুসরণ করার এক ব্যর্থ চেষ্টা করে; যেখানে খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই যুগের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এর বাইরেও রয়েছে সেকেলে পাঠ্যসূচি, গতানুগতিক পাঠদান পদ্ধতি এবং চাহিদাহীন বিষয়ের আধিক্য। যেমন একটি উদাহরণ দেওয়া যাক পাঠ প্রসঙ্গে। যদি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডিজিটাল সোশিওলজি’র মতো একটি আধুনিক কোর্সে সমাজবাস্তবতার অংশ হিসেবে ‘মিয়া খলিফা’, ‘হিরো আলম’ কিংবা সমাজে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব বিস্তারকারী ‘ওয়াজ মাহফিল’ নিয়ে কোনো সমালোচনামূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক পঠন-পাঠন চালু করতে উদ্যোগ নেয়, আমাদের তথাকথিত উদার ক্যাম্পাসে কি তা সম্ভব হবে? এর পরিণতি সহজেই অনুমেয়।
তাই চিন্তার এই স্থবিরতা নিয়ে পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে টিকিয়ে রাখা কঠিন হচ্ছে, সেখানে উচ্চশিক্ষা নিয়ে এই খামখেয়ালিপনা আত্মঘাতী ছাড়া আর কিছুই নয়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতির ময়নাতদন্ত জরুরি। ছাত্রসংগঠনগুলো নিজস্ব গোষ্ঠীস্বার্থে বেপরোয়া আর শিক্ষক সমিতি দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে মত্ত। অনেকেই যুক্তি দিয়ে থাকেন, ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্র সংসদ সচল করলেই ছাত্ররাজনীতির সব কদর্যতা দূর হয়ে যাবে। সমকালীন প্রেক্ষাপটে, এই যুক্তি অসার প্রমাণিত। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (ঢাবি, রাবি, চবি, জাবি) বর্তমান পরিবেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে, তথাকথিত ছাত্র সংসদের নেতারা শুধু লেজুড়বৃত্তিই করছেন না, বরং খোদ উপাচার্যের সিন্ডিকেট সভায় দরজা ধাক্কিয়ে ঢুকে আইন লঙ্ঘন করছেন নির্বিবাদে। অন্যদিকে, কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের চেয়ার টিকিয়ে রাখতে এখানেও আপস করছেন।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ও শিক্ষক মূল্যায়নের আধুনিক ব্যবস্থা চালু করা। শিক্ষকের নিয়মিত ক্লাস, গবেষণার মান, বিষয়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানসম্মত জার্নালে নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে কিনা কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতিতে তাঁর কাজের অবদান তদারকির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তাগিদ বা প্রণোদনা নেই। নেই কোনো বাধ্যবাধকতাও। ফলে কেবল দলীয় আনুগত্যের জোরে অনেকে যোগ্যতা ছাড়াই অধ্যাপক হয়ে যাচ্ছেন। বিপরীতে সব শর্ত পূরণ করার পরও ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ বা দলীয় রাজনীতি না করার কারণে অনেকের পদোন্নতি আটকে থাকছে বছরের পর বছর।
চতুর্থত, র্যাঙ্কিংয়ের মরীচিকা। র্যাঙ্কিংয়ের পেছনে দৌড়ানোর আগে প্রয়োজন ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করা এবং এর জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা। পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা অস্ট্রেলিয়ার দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানকার কোনো ‘নিম্নসারির’ বিশ্ববিদ্যালয়, যা কোনো বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ধারেকাছেও নেই, সেখানকার একাডেমিক পরিবেশ, কারিকুলাম, সুযোগ-সুবিধা এবং শিক্ষার্থীদের চিন্তার যে উৎকর্ষ ও কর্মসংস্থান যোগ্যতা তার তুলনায় আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের অর্জন যোজন যোজন দূরে। বাংলাদেশে যে নগণ্যসংখ্যক আন্তর্জাতিক মানের গবেষক বা শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছেন, তা তাদের ব্যক্তিগত মেধা ও রুচির গুণেই হচ্ছেন বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। এতে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অবদান নগণ্য, যা আমাদের প্রতিদিনকার এই বিষয়ক তর্ক ও আলোচনায় স্পষ্ট।
সরকারের বোঝা উচিত, প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একটি করে ইটের খাঁচা তৈরি করার নাম উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার ন্যূনতম বোঝাপড়া তৈরি হওয়ার আগেই কেবল ভবন নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ ও ক্রয়ের বিশাল বাজেট বরাদ্দ এবং নিজেদের দলের লোকদের চাকরি দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে একেকটি ক্যাম্পাস খোলা হচ্ছে। পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক, আন্তর্জাতিক মানের লাইব্রেরি, গবেষণাগার এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত না করে এভাবে যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এই আত্মঘাতী জেদ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া জরুরি।
ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, অধ্যাপক ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- সাজ্জাদ সিদ্দিকী