শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার ১০ বছর
ঝর্ণা হত্যায় জড়িতদের দ্রুত সর্বোচ্চ সাজা চান ছেলে
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৭ | আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ১১:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজ ৭ জুলাই। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহের পাশে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ১০ বছর। ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ছিল ঈদুল ফিতর। এদিন সকাল পৌনে ৯টার দিকে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রায় ২০০ গজ উত্তর-পশ্চিম কোণে পুলিশের চেকপোস্টে জঙ্গি হামলা হয়। হামলায় আনসারুল হক ও জহিরুল ইসলাম নামে দুই পুলিশ সদস্য এবং নিজ বাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝর্ণা রানী ভৌমিক নামে এক গৃহবধূ নিহত হন। আবির রহমান নামে এক জঙ্গিও পুলিশের পাল্টা গুলিতে মারা যান।
ঝর্ণা রানী ভৌমিকের একমাত্র সন্তান শুভদেব ভৌমিক সে সময় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। এখন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে চতুর্থ সেমিস্টারে পড়ছেন। গতকাল সোমবার কথা হয় শুভদেবের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাবা গৌরাঙ্গনাথ ভৌমিকের খুব আশা ছিল, মা হত্যার বিচার দেখে যাবেন। ২০২৪ সালের ১৮ জুন তিনি মারা গেছেন। শুভদেব আশায় বুক বেঁধে আছেন, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে।
শোলাকিয়ার ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগে ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিসান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়। এ কারণে শোলাকিয়া ঈদগাহে নেওয়া হয়েছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঈদগাহের প্রতিটি প্রবেশপথে বসানো হয় পুলিশ চেকপোস্ট।
৭ জুলাই সকালে ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবির রহমান (২৩) ও গাইবান্ধার শিক্ষার্থী শফিউল ইসলাম (২২) ব্যাগে রিভলবার, হ্যান্ড গ্রেনেড ও প্যান্টের বিশেষ ধরনের পকেটে চাপাতি নিয়ে শোলাকিয়া ঈদগাহের দিকে যেতে থাকেন। ঈদগাহের ২০০ গজ দূরে আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের চেকপোস্টে তল্লাশির সময় তারা ব্যাগ থেকে গ্রেনেড বের করে বিস্ফোরণ ঘটান। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে পুলিশ সদস্য আনসারুল হক ও জহিরুল ইসলামকে হত্যা করা হয়। আহত হন আরও অন্তত ১০ পুলিশ সদস্য।
এ সময় আশপাশের চেকপোস্টের পুলিশ সদস্যরা এসে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ চলে বন্দুকযুদ্ধ। এক পর্যায়ে আবির রহমান মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। গুলি বিনিময়ের সময় ওই এলাকার নিজ বাসায় জানালা ভেদ করে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝর্ণা রানী ভৌমিক মারা যান। সেদিন বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অপর জঙ্গি শফিউল ইসলাম রিভলবারসহ আটক হন। একই এলাকা থেকে কিশোরগঞ্জ শহরের মনিপুরঘাট এলাকার যুবক জাহিদুল হক তানিমও (৩৩) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন। তদন্তে জঙ্গিদের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
এ হামলার ঘটনায় সেদিন চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকারী পাকুন্দিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. শামসুদ্দিন বাদী হয়ে ১০ জুলাই কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় সন্ত্রাস দমন আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা করেন। প্রথমে শফিউল ইসলাম ও জাহিদুল হক তানিমকে আসামি করা হয়। পরে তদন্ত করে মোট ২৪ জনকে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে বিভিন্ন সময় এনকাউন্টারে শফিউল ইসলামসহ ১৯ জন আসামি মারা যান।
মামলার আইনজীবী কিশোরগঞ্জের পাবলিক প্রসিকিউটর শাহ কামাল সরকার জানিয়েছেন, আটক পাঁচ আসামির মধ্যে হাইকোর্ট থেকে বড় মিজান ২০২৫ সালের ১৪ মে আর আনোয়ার হোসেন একই বছর ২ জুলাই জামিনে বেরিয়ে গেছেন। এখন বিভিন্ন কারাগারে বন্দি আছেন রাজীব গান্ধী, সোহেল মাহফুজ ও জাহিদুল হক তানিম। মামলার ১০২ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শামসুদ্দিনসহ ৬৬ জন। সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী তারিখ আগামী ৭ সেপ্টেম্বর। ২ নম্বর সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সুপ্রিয়া রহমান সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন।