ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়া

ভারতের মুখে ঝাল খাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র

ভারতের মুখে ঝাল খাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র
×

নাজমুস সাকিব

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত মাসে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’-এর নাম পরিবর্তন করে আবার পুরোনো নাম ‘প্যাসিফিক কমান্ড’-এ ফিরে গেছে। পেন্টাগনের দাবি, এটি কেবলই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি; অধিক্ষেত্র বা কাজের পরিধি এক রেখে স্রেফ পুরোনো নামে ফিরে যাওয়া। কিন্তু ভূ-রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ জানা যে কোনো মানুষ বলবেন, নাম কেবলই নাম নয়। নাম হলো এক ধরনের বার্তা, অবস্থান ও সংক্ষিপ্ত কৌশল। এগুলো আপনাকে সংকেত দেয়– কূটনীতি ও সামরিক তৎপরতার আগামী দিনগুলোতে কোন বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে।

২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ‘ইন্দো’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিল মূলত নয়াদিল্লির প্রতি সম্মান দেখিয়ে। এরই মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই বার্তা দিয়েছিল– এই দ্বিপক্ষীয় বিশ্বে চীনই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী; আর ভারতের ভূমিকা হলো তার অপরিহার্য গণতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষাকারী। তা ছাড়া ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর দুটিই আসলে একটি অবিভাজ্য কৌশলগত অঞ্চল। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস তখন বলেছিলেন,

এই নামকরণ প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারতের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংযোগেরই স্বীকৃতি। তাঁর ভাষায়, ‘বলিউড থেকে হলিউড, আর পেঙ্গুইন থেকে পোলার বিয়ার বা মেরু ভল্লুক পর্যন্ত।’
কিন্তু দৃশ্যত সেই দিন আর নেই। ‘ইন্দো’ শব্দটি হারিয়ে গেছে। আর এই প্রতীকী পরিবর্তনের বিষয়টি দ্রুতই সবার নজর কেড়েছে। এই নাম পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ভারতীয় সংসদ সদস্য শশী থারুর এক্সে লিখেছেন, ‘কোয়াড (আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও জাপানের জোট)-এর কফিনে কি আরও একটি পেরেক ঠোকা হলো?’

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এই পদক্ষেপের তাৎপর্য আরও অনেক গভীর। ওয়াশিংটন নীরবে একটি যুগের সমাপ্তি ঘোষণা করছে, যে যুগে ভারতকে এই অঞ্চলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রকার ‘সাবকন্ট্রাক্টর’ মনে করা হতো। এর পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এবং বেশ কিছু জোরালো কারণ। 

বহু বছর ধরে উপমহাদেশের মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ভারতের নামটিই ছিল সবচেয়ে বড় হরফে লেখা; অন্যদিকে পাকিস্তান ছিল মাথাব্যথা। বাংলাদেশ ছিল স্রেফ একটি পোশাক কারখানা ও উন্নয়ন প্রকল্প। আর নেপাল ছিল হিমালয়ের একটি বাফার স্টেট বা মধ্যবর্তী রাষ্ট্র, যার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নয়াদিল্লির সঙ্গে কথা বলাটা উত্তম মনে করা হতো। ছোট ছোট প্রতিবেশী তাত্ত্বিকভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হতো যেন তারা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের একেকজন ভাড়াটিয়া। সেই মানচিত্রটি এখন বাস্তব সময়ে নতুন করে আঁকা হচ্ছে।
একটি নতুন ও আরও গতিশীল দক্ষিণ এশিয়ার উত্থান ঘটছে, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সরাসরি এবং আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের সঙ্গে। এদেরকে নতুনভাবে দেখা হচ্ছে, যেখানে তারা ভারতের আঞ্চলিক নীতির কোনো অনুষঙ্গ হিসেবে নয়; বরং নিজস্ব ক্ষমতা, সম্পদ ও স্বার্থসম্পন্ন স্বাধীন শক্তি। এরই মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হচ্ছে, যে কোনো ব্যবসায়িক লেনদেনের মতোই মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালকে বাদ দেওয়াটা এখানে উভয় পক্ষের জন্যই সুবিধাজনক। 

এই দেশগুলো যে আবার স্নায়ুযুদ্ধের আমলের মতো অন্ধ মিত্র হয়ে উঠছে, তা কিন্তু নয়। বরং তারা আরও আধুনিক এবং বহুলাংশেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও দরকারি কিছু হয়ে উঠছে। যেমন ‘কৌশলগত অংশীদার’, যারা স্বার্থের মিল থাকলে একসঙ্গে কাজ করে। একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া, ভারত বা অন্য যে কোনো দেশের সঙ্গে লেনদেনের স্বাধীনতাও অক্ষুণ্ন রাখে।
কিছু ভারতীয় কৌশলবিদ দাবি করেছেন, এই ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হওয়াটা ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রকার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীতেও পরিণত করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন কর্মকর্তারা দিন দিন ভারতকে শুধু একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবেই দেখছেন না, বরং একটি উদীয়মান বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও দেখছেন। ওষুধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা একদিন মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের একমেরু বিশ্বের সেই সোনালি অধ্যায়ে চীনের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমেরিকা ভারতের ক্ষেত্রে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে নারাজ। ব্যবসায় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তখন মার্কিন স্বার্থের বিনিময়ে চীনই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল। 

আরও বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে, ওয়াশিংটন এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতসহ কোনো একক শক্তির আধিপত্য ঠেকাতে বদ্ধপরিকর। আর তারা এ অঞ্চলে সক্রিয়ভাবে একটি বহুমাত্রিক আঞ্চলিক ভারসাম্য গড়ে তুলছে। আমরা আসলে যা প্রত্যক্ষ করছি তা হলো, আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের ‘ভেটো’ ক্ষমতার অবসান। ওয়াশিংটন এখন আর দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি রাজধানীকে নয়াদিল্লির শাখা অফিস হিসেবে বিবেচনা করা বন্ধ করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে বেছে বেছে সমঝোতা করছে। নয়াদিল্লির উদ্বেগ এবং তাদের একটি অনুগত শাসন ব্যবস্থা হারানোর ভয় থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণকে সমর্থন জানাচ্ছে। এ ছাড়া নেপালের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছে এবং মিয়ানমারে এমন সব পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা ভারত 
সরকার তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য জটিল মনে করছে।

নাজমুস সাকিব: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কেনটাকির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক; আলজাজিরা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত
ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×