ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

চাঁদার জন্য ‘স্পর্শকাতর’ চাপ

চাঁদার জন্য ‘স্পর্শকাতর’ চাপ
×

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভিডিওটি ইতোমধ্যে ভাইরাল। বরিশালে একজন ব্যবসায়ীর অফিসে ঢুকে তাঁর সংবেদনশীল জায়গায় চেপে ধরে দুটি চেক ও স্ট্যাম্পে সই নিয়েছেন একজন। দল বেঁধে ঢুকলেও দলনেতা একাই আসল কাজ সম্পন্ন করেছেন। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, ব্যবসায়ীকে মারধর করা হয়। ব্যবসায়ীর অভিযোগ, দুটি সাদা চেক ও দুটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিতে তাঁর অণ্ডকোষ চেপে ধরা হয়। বাধ্য হয়ে তিনি চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে দেন। বলা বাহুল্য, ভিডিওটি ভুক্তভোগী নিজেই সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দিয়েছেন। 

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যবসায়ী একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের এমডি আবদুল আজিজ। তাঁকে হেনস্তাকারী ব্যক্তি মোস্তাফিজুর রহমান, যিনি বরিশালের কাঠপট্টি এলাকার বাসিন্দা। তিনি যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও কোনো পদ-পদবি নেই। তবে তাঁর ভাই মাহবুবুর রহমান বরিশাল নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি। যুবদল অবশ্য জানিয়েছে, মোস্তাফিজুর রহমান তাদের দলের কেউ নন। উভয়ের মধ্যে একসময় ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। 

ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে মোস্তাফিজুর রহমান তাঁর কাছে এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন। অথচ সঙ্গে ব্যবসায়িক সব ধরনের হিসাব আগেই চূড়ান্ত হয়ে যায়। তিনি দাবি করা অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় নির্যাতন চালিয়ে চেক ও স্ট্যাম্পে সই নিয়ে যান।

কয়েক বছর আগেই যেখানে ব্যবসায়িক সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, সেখানে হঠাৎ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ দাবি করা এবং ২৭ জনের একটি দল নিয়ে ব্যবসায়ীর অফিসে গিয়ে অণ্ডকাণ্ডের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক না থাকার কোনো কারণ নেই। কারণ পায়ের নিচে শক্ত মাটি না থাকলে এভাবে একজনের অফিসে দলবল নিয়ে গিয়ে সন্ত্রাসী কায়দায় জোর করে ৭০ লাখ টাকার চেক কেউ লিখিয়ে নেওয়ার সাহস করার কথা নয়।  

বরিশালের যুবদলের নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছেন, মোস্তাফিজুর রহমান বিএনপি, যুবদল বা অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন। তাদের দাবি সঠিক হলেও বলা বাহুল্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীর চাঁদাবাজি খবর প্রকাশিত হয়ে আসছে। চাঁদা না পেয়ে আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে হুমকি-ধমকির উল্লেখযোগ্য ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর অনেকে দল থেকে বহিষ্কৃতও হয়েছেন। গত মাসেও বিএনপির একজন সংসদ সদস্যের ছেলেকে চাঁদাবাজির কারণে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের কাছে ছেড়ে দেয়।

চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে অধিকাংশ ঘটনাতেই স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়। কারণ তারা আইনশৃঙ্খলাকে যেভাবে থোড়াই কেয়ার করে, সাধারণ মানুষের সেই সাহস থাকার কথা নয়। বরিশালের ঘটনায় আমরা যেমনটা দেখেছি, ভুক্তভোগীর কাছে তিনি চাঁদা দাবি করেছেন। তাতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে দলবল নিয়ে তাঁর অফিসে হাজির হয়েছেন। তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেছেন এবং স্পর্শকাতর জায়গায় চাপ দিয়ে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায় করে নিয়েছেন। তাদের যদি ব্যবসায়িক লেনদেন থাকত, তবে তাঁর উচিত ছিল আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া। তা না করে এমন সন্ত্রাসী আচরণ কেন?

ব্যবসায়ী নিপীড়নের ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ ত্বরিত গতিতে অপরাধীকে ধরেছে। ব্যবসায়ী অবশ্য মামলা করেছেন এবং ব্যাংকে ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে অবহিত করার কারণে টাকা তুলতে পারেনি। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তার প্রশ্ন এবং সাধারণের বিচার পাওয়ার বিষয় যুক্ত। এর আগেও আমরা দেখেছি, যখনই কোনো ঘটনা সংবাদমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, তখনই তার ত্বরিত সমাধান হয়েছে। এমন পরিস্থিতি নাগরিক হিসেবে আমাদের শঙ্কিত করে। আইন যদি নিজের গতিতে না চলে; ভাইরাল হওয়া এবং প্রভাবশালী কারও সুপারিশ ছাড়া যদি কাজ না হয়, তবে সাধারণ মানুষের আরও দুর্গতি আছে।

মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×