ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

ব্যর্থ জালিয়াতিই যখন ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপলক্ষ্য

ব্যর্থ জালিয়াতিই যখন ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপলক্ষ্য
×

ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

মেরিনা হাইড

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ২০:৩৮ | আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ২০:৫৪

‘উদ্ভট ও বিব্রতকর’ প্রেসিডেন্ট জালিয়াতি করার পরও ফুটবল মাঠে যুক্তরাষ্ট্র দলের এই ভরাডুবি দেখা সত্যিই দারুণ! তবে তাদের এই হার পুরো বিশ্বকে এক সুতোয় বেঁধেছে। বেলজিয়ামের এমন প্রতিরোধে শেষ কবে বিশ্বজুড়ে এত মানুষ একসঙ্গে উল্লাস করেছে, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। সেটা সম্ভবত ১৯১৪ সালে, যখন জার্মানরা প্রথম মিউজ নদী পার হয়।

আপনারা হয়ত এরইমধ্যে জেনেছেন, এবারের বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের বিদায় করেছে সবদিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব দেখানো বেলজিয়াম। এর আগে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বড়াই করে বলেন, ‘মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড প্রত্যাহারের জন্য ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে তিনবার ফোন করেছি। হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলেও জালিয়াতি করে, কথাটা সবাইকে জানিয়ে দিন।’

ফিফার এবারের টুর্নামেন্ট ঘিরে ‘শিটহাউসারি’ (মাঠে প্রতিপক্ষকে উসকানি দেওয়া বা নোংরা কৌশল খাটানো) শব্দটা আমাদের সামনে এসেছে, আপনারা অনেকে শুনেছেন। এমনকি মার্কিন ধারাভাষ্যকারদের কেউ কেউ অত্যন্ত দৃষ্টিকটূভাবে তাদের আলোচনায় শব্দটা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন।
 
ভাইসব, দয়া করে থামুন- শব্দটা আপনাদের জন্য নয়। আপনাদের জন্য ‘আর্বস’, ‘আ কাপল থিংস’, কিংবা ‘আ ওয়েজ টু গো’-এর মতো বুলিই ঠিক আছে। তবে গত কয়েকদিন ক্ষমতা অপব্যবহারের যে নগ্ন রূপ দেখা গেছে, তাকে বিশ্বের সব ভাষায় যে নামে ডাকা উচিত, তা হলো- ‘হোয়াইটহাউসারি’ (হোয়াইট হাউসের ক্ষমতার অপব্যবহার)। আর এই ‘হোয়াইটহাউসারি’ ভুলে যেতে আমাদের অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। ট্রাম্প নিজে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এতটাই আতঙ্কিত ছিলেন যে, সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে বিড়বিড় করে বলেন- সপ্তাহান্তে তার এই অন্যায্য হস্তক্ষেপ নাকি দারুণ এক কাজ ছিল! কারণ তিনি এসব কাজে ওস্তাদ।
 
মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প নাকি খেলাধুলা খুব ভালো বোঝেন! অথচ তিনি এই সহজ সমীকরণটা বোঝেন না যে, আপনি যদি প্রতিপক্ষের সঙ্গে চরম অন্যায় কিছু করেন, তবে তারা সেই অন্যায়কে নিজেদের তাতিয়ে তোলার হাতিয়ার বানিয়ে আপনাকে ধুয়ে দেবে।

অনেকে স্ট্রাইকার বালোগানের জন্য সহানুভূতি বোধ করছেন। কারণ তিনি তো সেধে প্রেসিডেন্টের এই কলুষিত ছায়া নিজের ওপর চাননি। লন্ডনে বেড়ে ওঠা বালোগান এটি একেবারেই চাওয়ার কথা নয়। কারণ তিনি এমন শ্রেণির মানুষ, যাদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার খর্ব করতে ট্রাম্প সবকিছু করতে পারতেন, যদি না গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট সেই প্রচেষ্টা নাকচ করে দিত। কী আর বলার- ‘যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।’

ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর জন্য কারও মনে বিন্দুমাত্র সহানুভূতি এই মুহূর্তে নেই- এটি দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। তবু এখন সব আলো তার দিকেই ঘুরিয়ে দেওয়া দরকার। কারণ, ফিফার তথাকথিত স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সংস্থাকে দিয়ে রহস্যময় ‘ধারা ২৭’ সচল করে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পেছনে ইনফান্তিনো চরম আষাঢ়ে গল্প ফেঁদেছেন। আর তাকে বাহবা দিয়ে একটি মার্কিন সাময়িকী লিখেছে, ‘ফিফার সততা রক্ষা করলেন ইনফান্তিনো।’ 

আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, আমাদের এই দিনও দেখতে হচ্ছে! আমরা এখন আক্ষরিক অর্থেই শূন্যতাবাদী ‘ব্লাটারকে ফিরিয়ে আনো’ যুগে বাস করছি। ফিফার সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটার, যাকে শেষবার দেখে মনে হয়েছিল তিনি গাড়ির ভেতর ঘুমান। গত বছর আপিলে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে কোনোমতে খালাস পেয়েছেন তিনি। গতকাল তার উত্তরসূরির (ইনফান্তিনো) ওপর দুই পায়ে স্লাইডিং ট্যাকল করেছেন। ব্লাটার হুংকার দিয়ে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক তদবিরের ফোনে লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত বাতিল হয় না।’ 

তাহলে কীসে হয়? বস্তাভর্তি টাকা আর দামি হাতঘড়িতে? দৃশ্যত তাও নয়। ব্লাটার বলেন, ‘নিয়ম, প্রমাণ এবং স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমেই কেবল সিদ্ধান্ত বাতিল হতে পারে।’ বাঃ, কে জানত!

ইউরোপীয় ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা উয়েফা যে ইনফান্তিনোকে এর চেয়ে বেশি ঘৃণা করতে পারত না, তা ভুল প্রমাণিত হলো। তারা এখন তাকে আরও বেশি ঘৃণা করে। উয়েফা নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে দীর্ঘ বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘যখন নিয়মের অভিভাবকরাই নিয়মের নিশ্চয়তা দিতে পারেন না, তখন খেলার সততা ঝুঁকির মুখে পড়ে। একটি টুর্নামেন্টের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয় এই ধরনের নজিরবিহীন, অবিশ্বাস্য এবং অসমর্থনযোগ্য সিদ্ধান্তে আমরা বিস্ময় প্রকাশ করছি।’ উয়েফা বলেছে, ফিফার সিদ্ধান্তটি ‘রেড লাইন’ বা সব সীমা অতিক্রম করেছে। রেড লাইন, সব সীমা- এসব আবার কী? 

মানচিত্রের বালাই যদি নাই-ই থাকে, নৈতিকতার গ্যালাক্সিও আমরা পেরিয়ে এসেছি কয়েক আলোকবর্ষ আগে। সম্ভবত তখনই, যখন ইনফান্তিনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেই ‘গাজা শান্তি সম্মেলন’-এর ফটোসেশনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। অথবা যখন নিজেই ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ চালু করে তা ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়েছেন। 

যাই হোক, জল অনেক দূর গড়িয়েছে। বালোগান-কাণ্ডের কারণে ফিফার বিরুদ্ধে নৈতিকতা তদন্তের দাবি তুলেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কয়েক সদস্য। একদিকে তদন্তের এই দাবি, অন্যদিকে সততা নিয়ে খোদ সেপ ব্লাটারের প্রশ্ন! একটা নাটক বটে!

আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের এই দলটি যদি ১৯৯৩ সালের ঘুস-সহায়তা পাওয়া মার্সেই দলের বিপক্ষে খেলে এবং ম্যাচটি যদি দুর্নীতিবাজ জার্মান রেফারি রবার্ট হয়জার পরিচালনা করেন, তবু ইনফান্তিনোর ফিফা প্রেসিডেন্ট পদ দুর্বল হবে না। কারণ, সবকিছু মিলিয়ে ইনফান্তিনো এই মুহূর্তে তার সংস্থায় অপরাজেয়। ইউরোপের বাইরের সদস্য দেশগুলোকে তিনি অনুদান ও উন্নয়ন তহবিল দিয়ে দারুণভাবে হাতের মুঠোয় রেখেছেন। তবে নিশ্চয় একদিন এই চিত্র বদলাবে। কেননা, ফিফায় ক্ষমতার জন্য আরও বেশি লোভী কেউ না কেউ সবসময় ওত পেতে আছেন। 

এখন শুধু এটাই আশা করার, শেষ পর্যন্ত যারা চ্যাম্পিয়ন হবেন, তারা যেন তাদের গৌরব ছিনতাই করার সুযোগ না দেন। 

লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের নিবন্ধ লেখক

আরও পড়ুন

×