ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

অপরিকল্পিত নগরায়ণের ঢাকা বাসযোগ্য হবে কি?

অপরিকল্পিত নগরায়ণের ঢাকা বাসযোগ্য হবে কি?
×

রাজধানী ঢাকা শহর (ফাইল ফটো)

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৫৮

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-ইআইইউর বৈশ্বিক বসবাসযোগ্যতার সূচকে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার অবস্থান তলানির দিকে। এই শহরের প্রধান সমস্যাগুলো এখন দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, একের পর এক সরকার পরিবর্তিত হলেও এই সংকটের টেকসই বা সুদূরপ্রসারী সমাধানে কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে নগরায়ণের নামে ঢাকা যেভাবে অপরিকল্পিতভাবে এক কংক্রিটের জঞ্জাল হিসেবে গড়ে উঠেছে, সেই ধারাটি দিন দিন আরও জটিল ও সংকটাপন্ন রূপ নিয়েছে।

উন্নয়নের ডামাডোলে বিগত বছরগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকার বহু মেগা প্রকল্প আমরা বাস্তবায়ন হতে দেখেছি। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘মেট্রোরেল’ কিংবা ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ নিঃসন্দেহে আমাদের এক বড় অর্জন এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি। কিন্তু সামগ্রিক অর্থে এই আংশিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন কি কোটি মানুষের এই মেগাসিটিকে বসবাসযোগ্য করতে পেরেছে? উত্তরটি অত্যন্ত নিরাশাজনক। কারণ ঢাকার মূল ব্যাধিটি কেবল ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেলের লাইনে নয়, এর গভীরে প্রোথিত অপরিকল্পিত নগরায়ণ, উপচে পড়া জনসংখ্যা এবং সুশাসনের চরম অভাব।

ইআইইউ সূচকের আয়নায় ঢাকার বহুমাত্রিক ক্ষত ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সূচকটি মূলত পাঁচটি প্রধান কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। সেগুলো হলো স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো। সমকালের প্রতিবেদন এবং বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই প্রতিটি সূচকেই ঢাকার স্কোর ভয়াবহভাবে নিম্নমুখী। এর বাইরেও নাগরিক জীবনকে প্রতিনিয়ত বিষিয়ে তুলছে আরও বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও অনিয়ন্ত্রিত সংকট।

বাসা ভাড়ার নৈরাজ্য ও আবাসন সংকট: মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের আয়ের সিংহভাগই গিলে খাচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত বাসা ভাড়া। কোনো আইনি নিয়ন্ত্রণ বা কার্যকর মনিটরিং না থাকায় বাড়িওয়ালারা এ ক্ষেত্রে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং শহরের অর্ধেকের বেশি মানুষ মানবেতর আবাসন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ না করার সংকট: শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসাসেবা, কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে উচ্চ আদালতের রিট বা সরকারি নথি–সবকিছুর জন্যই দেশের মানুষকে ঢাকামুখী হতে হয়। এই বিকেন্দ্রীকরণের অভাবই ঢাকাকে দিন দিন এক অনাকাঙ্ক্ষিত জনবিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার চাপ নেওয়ার ক্ষমতা এই ক্ষুদ্র শহরের এখন আর নেই; তবুও ঢাকার ওপর দিন দিন চাপ বাড়ছে। 

পরিবেশগত বিপর্যয় ও তীব্র বায়ুদূষণ: ঢাকা প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করে। অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এই শহরকে এক শ্বাসরুদ্ধকর গ্যাস চেম্বারে পরিণত করেছে। পার্ক, খেলার মাঠ বা সবুজ জায়গার উপস্থিতি এখানে এখন মরীচিকা।

জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা বেহাল: ডেঙ্গু বা যে কোনো সংক্রামক ব্যাধি ছড়ালে ঢাকার পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। সরকারি হাসপাতালে শয্যা ও ওষুধের তীব্র সংকট আর বেসরকারি খাতের লাগামহীন বাণিজ্যে সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রতিনিয়ত উপেক্ষিত হচ্ছে। 

জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সংকট: সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি ডুবে যায়। ধানমন্ডির মতো পুরোনো আবাসিক এলাকার খানিক ভেতরে একটু বৃষ্টি হলেই চলাচলের রাস্তা থাকে না। শহরের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক খাল ও জলাশয়গুলো দখল-ভরাট করে আবাসন গড়ে তোলায় পানি নিষ্কাশনের পথগুলো সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। সরাসরি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে এসব ধ্বংসাত্মক কাজ হয়েছে। 

কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া উন্নয়ন অর্থহীন: ঢাকার ট্রাফিক জ্যামে প্রতিদিন যে কোটি কোটি শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, তার আর্থিক ক্ষতি বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা। অথচ একটি সমন্বিত ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেয়ে আমাদের ঝোঁক বরাবরই ছিল বড় বড় দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণের দিকে। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা না এনে, বাসের ফ্র্যাঞ্চাইজি রুট চালু না করে কিংবা ফিটনেসবিহীন গাড়ি উচ্ছেদ না করে কেবল খণ্ড খণ্ড মেট্রোরেল দিয়ে পুরো শহরের যানজট নিরসন অসম্ভব।

ঢাকার সুপেয় পানির সংকট: পাশাপাশি ঢাকার সুপেয় পানির সংকট এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়া আগামী দিনগুলোর জন্য এক বড় বিপদের সংকেত। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যাসহ চারপাশের নদীগুলো আজ বর্জ্যের ভাগাড়। অথচ ঢাকার মতো একটা শহরে পানি কিনে খাওয়াটা অভাবনীয় ঘটনা হওয়ার কথা। পরিবেশ ও প্রকৃতির এই নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ ঢাকার বসবাসযোগ্যতাকে পুরোপুরি হরণ করে নিয়েছে।

ঢাকা কেবল একটি শহর নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক হৃদপিণ্ড। এই হৃদপিণ্ডকে সচল রাখতে হলে লোক দেখানো বা সাময়িক উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বেরিয়ে এসে একটি বৈজ্ঞানিক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে ঢাকার বাইরের শহরগুলোকে উন্নত ও কর্মসংস্থানমুখী করতে হবে, যেন মানুষের ঢাকামুখী স্রোত কমে। একই সঙ্গে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে আবাসন, গণপরিবহন ও পরিবেশের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যথায় ইআইইউর অবাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার এই স্থায়ী আসন আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সব অর্জনকে একদিন ম্লান করে দেবে।

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 
 

আরও পড়ুন

×