ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

প্রাকৃতিক সম্পদ

কার্বন অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

কার্বন অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
×

খালেদ মিসবাহুজ্জামান

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন পরিবেশ রক্ষাকে শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শোষণ করার প্রক্রিয়া একটি সম্পূর্ণ নতুন ও অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে। এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নামই ‘কার্বন অর্থনীতি’। কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান যদি তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নির্গমন কমাতে পারে, তবে সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ হ্রাসকৃত কার্বনকে পরিমাপ করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ‘কার্বন ক্রেডিট’-এ রূপান্তর করা হয়।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অন্যতম শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হলেও এর ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে কার্বন অর্থনীতির বাজার হিসেবে একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দেশ। তবে বর্তমানের বৈশ্বিক কার্বন বাজারটি অত্যন্ত প্রযুক্তিগত, ডেটানির্ভর ও কঠোর যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কার্বন বাণিজ্যে অংশগ্রহণের অনন্য এবং অসাধারণ কিছু ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। প্রধান সম্ভাব্য খাতগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

টেকসই ও সংরক্ষণশীল কৃষি: বাংলাদেশের কোটি কোটি প্রান্তিক কৃষক প্রতিদিন যে জমিতে চাষাবাদ করছেন, সেই মাটির রয়েছে বিপুল পরিমাণ কার্বন ধরে রাখার ক্ষমতা। কম চাষাবাদ, ক্ষতিকারক রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার এবং উন্নত সেচ ব্যবস্থা। 

বন ও ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম: বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ, যা বিপুল পরিমাণ কার্বন তার মাটি ও উদ্ভিদে ধরে রাখে। সুন্দরবন ছাড়াও উপকূলীয় বনায়ন, সামাজিক বনায়ন এবং গ্রামীণ পারিবারিক বনায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিশাল পরিমাপের কার্বন ক্রেডিট তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নিয়মিত রাজস্ব আয় করা সম্ভব।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও শিল্প খাত: দেশের দ্রুত বর্ধনশীল সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, বায়োগ্যাস প্লান্ট এবং বায়ুশক্তি প্রকল্পগুলো কার্বন নির্গমন হ্রাসে সরাসরি অবদান রাখছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পরিবেশবান্ধব বা ‘সবুজ’ অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। কারখানার আধুনিকায়ন, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বর্জ্য পানির পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে এই খাত কার্বন ক্রেডিটের একটি অত্যন্ত লোভনীয় উৎসে পরিণত হতে পারে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার অর্থনীতি: বাংলাদেশে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের একটি বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি রয়েছে। এই অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে যদি নিয়মতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, তা থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব, যা কার্বন বাজারে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে।
অভিজ্ঞতা ও বর্তমান অগ্রগতি: বাংলাদেশ কার্বন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একেবারে নতুন নয়। এর রয়েছে অতীত ও বর্তমানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সফল অভিজ্ঞতার খতিয়ান–

সিডিএম যুগের শিক্ষা: কিয়োটো প্রটোকলের অধীনে ‘ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কার্বন অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। তিতাস গ্যাসের সঞ্চালন লাইনের লিকেজ মেরামত করে মিথেন অপচয় রোধ, কিছু উন্নত ইটভাটার আধুনিকায়ন এবং মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পগুলো এই আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ পেয়েছিল।
ইডকলের বৈশ্বিক সাফল্য: বাংলাদেশের কার্বন অর্থনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও বাস্তব উদাহরণ হলো ইডকলের সৌর হোম সিস্টেম কর্মসূচি। গ্রামীণ অবহেলিত এলাকায় ৩৩ লক্ষাধিক সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে যে বিপুল কার্বন নির্গমন কমানো সম্ভব হয়েছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে সফলতার সঙ্গে যাচাই করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে দেশ আন্তর্জাতিক কার্বন অর্থায়ন লাভ করেছে।
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ: বিপুল সম্ভাবনা এবং কিছু চমৎকার অতীত সাফল্য থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনও আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে প্রধান অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এর পেছনে কিছু বড় নীতিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত অন্তরায় রয়েছে:

নীতিগত অস্পষ্টতা ও আইনি কাঠামোর অভাব: বাংলাদেশে এখনও কার্বন ক্রেডিটের প্রকৃত আইনি মালিকানা কার– প্রান্তিক কৃষক, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নাকি রাষ্ট্র– তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। এর ফলে অর্জিত আয় বা রাজস্বের বণ্টন কীভাবে হবে, তা নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়ে গেছে, যা বড় বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে।
এমআরভি ব্যবস্থার চরম সংকট: বাংলাদেশে এখনও কোনো কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কার্বন রেজিস্ট্রি, আধুনিক ডেটাবেজ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দক্ষ কার্বন নিরীক্ষক নেই। ফলে আমাদের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের সুফলগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ক্ষুদ্র ও খণ্ডিত অর্থনৈতিক কাঠামো: বাংলাদেশের কৃষি বা বর্জ্য খাত মূলত অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক। একজন ক্ষুদ্র চাষির পক্ষে এককভাবে আন্তর্জাতিক মানের জটিল কার্বন প্রকল্প তৈরি করা অর্থনৈতিকভাবে মোটেও লাভজনক নয়। হাজার হাজার কৃষককে একটি সুনির্দিষ্ট সমবায়ের আওতায় এনে বড় প্রকল্প তৈরি করার মতো প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আমাদের এখনও বেশ দুর্বল।
কঠোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সচেতনতার অভাব: বর্তমানে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে শুধু প্রকল্প স্থাপন করলেই ক্রেডিট পাওয়া যায় না। বরং ‘অ্যাডিশনালিটি’ বা এটি সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত কতটুকু পরিবেশগত অবদান রাখছে, তা প্রমাণ করতে হয়। 

বাংলাদেশে কার্বন বাণিজ্যের গতি আশানুরূপ না হওয়ার মূল কারণ সম্ভাবনার অভাব নয়, বরং দূরদর্শী প্রস্তুতির অভাব। বাংলাদেশ যদি তার বিদ্যমান নীতিগত অস্পষ্টতা দূর করে বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করতে পারে, তবে এই কার্বন অর্থনীতি ভবিষ্যতে দেশের জন্য একদিকে যেমন সবুজ ও টেকসই শিল্পায়নের মজবুত ভিত্তি তৈরি করবে, অন্যদিকে জলবায়ু সংকটকে সরাসরি একটি বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক নতুন ও নির্ভরযোগ্য উৎসে রূপান্তর করতে পারবে।

ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান: অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×