ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

জলে-ঢলে বিপর্যস্ত সিলেটের তিন জেলা

জলে-ঢলে বিপর্যস্ত সিলেটের তিন জেলা
×

মৌলভীবাজার-রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের গয়ঘর গ্রামের সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বন্যার পানি। গতকাল শনিবার তোলা সমকাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

টানা বৃষ্টি, উজানের ঢল ও বানের ধাক্কায় বাঁধে ভাঙন–এই তিন কারণে সিলেট বিভাগের তিন জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো। কোথাও কোথাও নদনদীর পানি কমতে শুরু করলেও দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক স্থানে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম।
সুনামগঞ্জে বিপর্যস্ত যোগাযোগব্যবস্থা

বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কুশিয়ারা নদীপারের পাইলগাঁও ও রানীগঞ্জ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল এবং দিরাই উপজেলার মার্কুলি এলাকায় সড়ক যোগাযোগের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। এছাড়া সুনামগঞ্জ শহরতলির কোরবাননগর, মোল্লাপাড়া ও লক্ষ্মণশ্রী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলোর হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত দুর্ভোগে পড়েছেন।

ঢলের পানিতে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কোরবাননগর ইউনিয়নের ধারারগাঁও-মাইজবাড়ী সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে গেছে। ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটির একাধিক স্থানে ভাঙন দেখা দেওয়ায় এবং মাটি সরে যাওয়ায় এটি এখন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তাহিরপুরের সীমান্ত সড়কের লালঘাট-বাঁশতলা অংশের প্রায় ২৫০ ফুট সড়ক ভেঙে গেছে। জরুরি প্রয়োজনে পারাপার চলছে খেয়া নৌকায়। জগন্নাথপুরে কুশিয়ারা নদীপারের রানীগঞ্জের পাকা সড়কের ১২ মিটার অংশ ধসে গেছে। 
শনিবার সকালে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে ডুবে থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে কাদা-পানি মাড়িয়ে শহরমুখী হচ্ছেন।
অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মো. মুনায়েম মিয়া বলেন, এটি এলাকার মানুষের একমাত্র সড়কপথ। ধোপাখালি খাল, নদী এবং আশপাশের বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারছে না। জনস্বার্থে অবিলম্বে এই খাল খনন ও সড়ক সংস্কার করা জরুরি।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, কাঠইড়-জয়নগর সড়কটি বৃষ্টি কমলেই দ্রুত মেরামত করে চলাচল উপযোগী করা হবে। এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, সব উপজেলাতেই গ্রামীণ কিছু সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টি কমলে মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।
বাঁধ ভেঙে ৩০ গ্রাম প্লাবিত, ক্ষুব্ধ মানুষ
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর তীররক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার কারণেই এই বাঁধ ভেঙেছে। ফলে বালুখেকোদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভে ফুঁসে উঠছে সাধারণ মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, লস্করপুর, লামাতাসি ও পইল ইউনিয়নের পাঁচ শতাধিক বাড়িঘরে এখন কোমরপানি। ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়ক, ফসলি জমি ও মাছের ঘের। শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের দুর্ভোগ গুরুতর। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রয়কেন্দ্র ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। অধিকাংশ নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় খোয়াই নদীর কালিগঞ্জ এলাকার বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর দ্রুত বেগে পানি ঢুকে নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাঁও, নতুন বাজার, বালিহাটা, কালীগঞ্জ, যাদবপুর, বিষ্ণুরামপুর, দক্ষিণচর, রামনগর, শিয়ালদাড়িয়া, মশাজান, সুলতানশীসহ অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। বর্তমানে খোয়াই নদীর পানি কিছুটা কমায় বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পানি কমলে দ্রুত ওই স্থানে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ এমপি বলেন, বন্যা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও খোয়াই নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা দেওয়ার কোনো সরকারি ব্যবস্থা নেই। বালু বিক্রি করে সরকারের টাকা আয়ের কোনো আগ্রহও নেই। যারাই অবৈধভাবে বালু বা মাটি উত্তোলন করে এই সংকট তৈরি করেছে, প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে।
ত্রাণ সরবরাহ ব্যাহত, বাড়ছে দুর্ভোগ

মৌলভীবাজারে নদনদীর পানি কমতে শুরু করলেও ত্রাণ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ অর্বর্ণনীয়। বানভাসিরা বর্তমানে তীব্র বিশুদ্ধ পানি ও গোখাদ্যের সংকটে ভুগছেন। উপদ্রুত এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টানা বৃষ্টি ও ঢলে জেলার মনু, ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ী নদী ভয়াল রূপ ধারণ করে। ৯ জুলাই মনু ও ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর ও একামধু এলাকার দুটি স্থানে বাঁধ ভেঙে যায়। এতে তিনটি ইউনিয়নের অন্তত ৫০টি গ্রামের ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। শনিবার সকাল থেকে পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে।

রাজনগরের কামারচাক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ জানান, ইউনিয়নের ৪২টি গ্রামের মধ্যে ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ গোখাদ্য নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় চলছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। ইউএনও অফিস থেকে কিছু শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হলেও নৌকার অভাবে দুর্গম গ্রামগুলোর পানিবন্দি মানুষের কাছে তা পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে যেসব গ্রামে যাতায়াত করা যায়, শুধু সেখানেই খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
টেংরা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন জানান, বন্যার কারণে বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে বিদ্যুৎসংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। 
রাজনগর ইউএনও বিপুল শিকদার জানান, শনিবার দুপুর পর্যন্ত শুকনো খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া রাজনগর উপজেলার জন্য ২০ টন চাল ও দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা পানিবন্দির হার বিবেচনা করে ইউপি চেয়ারম্যানদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বিভিন্ন ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। খলিলপুর ইউনিয়নের হামরকোনা, দাউদপুর, ব্রাহ্মণগ্রাম ও নতুনবস্তী গ্রামের প্রায় দুইশ পরিবার কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ায় এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি।

আরও পড়ুন

×