পিপিআরসির আলোচনা সভা
সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সৃজনশীল অর্থনীতিকে দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের নতুন খাত হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু বাজেট বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার, কর সুবিধা, কপিরাইট সুরক্ষা এবং একটি কার্যকর ইকোসিস্টেম। একই সঙ্গে শিল্প ও সৃজনশীলতাকে নিছক বিনোদন না ভেবে অর্থনৈতিক খাত হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
গতকাল শনিবার ‘সৃজনশীল অর্থনীতি: স্লোগান, নাকি অপ্রকাশিত সম্ভাবনা?’ শীর্ষক একটি ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) উদ্যোগে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
সভাটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন চলচ্চিত্র নির্মাতা তানিম নূর, চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, নাট্যকার বাকার বকুল, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন এবং ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদ বিন আব্দুস সালাম।
আলোচনায় জানানো হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে ৮০০ কোটি টাকার একটি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা সরাসরি বরাদ্দ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো এই খাতের মাধ্যমে জিডিপিতে অবদান বাড়ানো, পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে প্রতিষ্ঠিত করা।
তানিম নূর বলেন, সৃজনশীল খাতের জন্য আলাদা করনীতি প্রণয়ন করা গেলে এই খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশেষ করে চলচ্চিত্রে কর-ছাড়ের মতো প্রণোদনা দিলে নতুন ও পুরোনো উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীরাই আরও আগ্রহী হবেন।
রেদওয়ান রনি বলেন, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য পৃথক নীতিমালা না থাকায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধারণ করপোরেট কাঠামোর আওতায় কর দিতে হচ্ছে। অথচ বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলো এই ধরনের বাধ্যবাধকতার মুখোমুখি না হওয়ায় স্থানীয় উদ্যোক্তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তাই অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর ও লাইসেন্সিং নীতিতেও সংস্কার আনা জরুরি।
লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, দেশে সৃজনশীল প্রতিভার কোনো অভাব নেই। তবে সেই প্রতিভাকে বিকশিত ও বাণিজ্যিকভাবে সফল করার মতো অনুকূল পরিবেশ বা ইকোসিস্টেম এখনও গড়ে ওঠেনি। এজন্য শিল্পী ও নেপথ্য কর্মীদের সুরক্ষায় সহায়ক নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
বাকার বকুলের মতে, নাটক ও শিল্পকলাকে অর্থনৈতিক খাত হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ব্যক্তিগত আবেগ ও স্বেচ্ছাশ্রমের ওপর নির্ভরশীল এই খাতকে পেশাদার ও টেকসই শিল্পে রূপান্তর করতে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার।
প্রকাশনা খাতের প্রসঙ্গে মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, জাতীয় গ্রন্থনীতি হালনাগাদ করা, কপিরাইট আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং ডিজিটাল ও মুদ্রণ পাইরেসি রোধে আরও কঠোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
হস্তশিল্প খাতের উদ্যোক্তা তৌহিদ বিন আব্দুস সালাম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে পণ্যের মান সনদ, কমপ্লায়েন্স এবং শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং অপরিহার্য।
সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; কার্যকর ব্যবস্থাপনা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, করনীতি, রয়্যালটি বণ্টন, কপিরাইট সুরক্ষা ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য একটি ফলাফলভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণের ওপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।
- বিষয় :
- অর্থনীতি