সড়কজুড়ে খানাখন্দ, বর্ষণে ভোগান্তি
কুষ্টিয়ার কুমারখালী শহর থেকে পান্টি বাজারগামী গ্রামীণ সড়ক এমন অসংখ্য ছোট-বড় খানাখন্দে ভরে গেছে সমকাল
বাউফল (পটুয়াখালী) ও কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাঁচ দিনের টানা ভারী বর্ষণে পটুয়াখালীর বাউফল পৌরসভাসহ ১৫টি ইউনিয়নের পাকা সড়ক, কাঁচা সড়ক ও বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে নদীসংলগ্ন বেড়িবাঁধের প্রায় ১০০ কিলোমিটার, ৩০-৪০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক রয়েছে। উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এসব সড়ক সংস্কারের জন্য ১২০ কোটি টাকার প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রাক্কলন তৈরি করেছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিনের বর্ষণে কালাইয়া-লোহালিয়া হয়ে পটুয়াখালী জেলা শহর সড়কের প্রায় ৮ কিলোমিটার অংশে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া নওমালার আশুড়ির হাট-গোলা বাড়ি, নয়াহাট ডা. রাইচরণ রায়ের বাড়ি হয়ে গোলাবাড়ি সড়ক, কাছিপাড়া, বাহের চর, গোপালিয়া, কারখানা-ঝিলনা সড়ক, কেশবপুর-মমিনপুর, ভরিপাশা-নুরাইনপুর সড়ক, নুরাইনপুর-ইন্দ্রকুল সড়ক, কালিশুরি-শিবপুর-কনকদিয়া সড়ক, বগা-সাবুপুড়া সড়ক, নাজিরপুর-নিমদি সড়ক, দাসপাড়া-খেজুরবাড়িয়া সড়ক, বাঁশবাড়িয়া-হোসনাবাদ সড়ক, অলিপুড়া-সাবুপুড়া সড়ক, ধুলিয়া-মঠবাড়িয়া সড়কেও খানাখন্দ বেড়েছে। এসব সড়কের বাইরেও ক্ষতি হয়েছে ধুলিয়া-মেহেন্দির হাট সড়ক, মদনপুরা-বিলবিলাস সড়ক, কনকদিয়া-দরগাবাড়ি সড়ক, নওমালা-পাগলার বাজার-সাবুপুরা সড়ক ও আদাবাড়িয়া গোলাবাড়ি-হাজির হাট সড়কেও। বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন চন্দ্রদ্বীপের ১০টি পাকা সড়কও একই পরিস্থিতিতে পড়েছে।
নিজবটকাজল এলাকার আটোরিকশা চালক সুমন মাঝির ভাষ্য, ঋণ নিয়ে অটোরিকশা কিনেছেন। সেই আয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি কিস্তি শোধ করেন। যাত্রী নিয়ে বাউফল সদরে যাওয়ার পথিমধ্যে কয়েকদিন আগে আশুরির হাট বাজারে ভাঙা সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হন। এখন বের হতে পারছেন না। যে কারণে ঘরে চাল নেই।
বাউফল-পটুয়াখালী সড়কের পাশে হোলাবুনিয়ায় বাড়ি এলেম গাজীর। তিনি বলেন, আশুরির হাট থেকে নগরহাট-কালাইয়া পর্যন্ত সড়কে মাছ চাষ করা যায়। মাঝে মধ্যে কুয়ায় (গর্ত) ইট দিলেও তা বৃষ্টিতে সরে গেছে। এ কারণে যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছে। বর্ষার আগে সড়কের গর্তগুলো মেরামত করলে এই দুরাবস্থার সৃষ্টি হতো না বলেও মনে করেন তিনি।
দশমিনা-বাউফল-ঢাকা সড়ক রুটে অটোরিকশা চালক সুমনের ভাষ্য, বগা ফেরি পার হয়ে ভাঙা ব্রিজ পর্যন্ত একদিন যাত্রী পরিবহন করলে পরের দিন যেতে পারেন না। শরীরজুড়ে ব্যথা হয়ে যায়। গাড়ি গর্তে পড়লে ৩-৪ ঘণ্টা লেগে যায় উঠাতে।
নওমালা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শেফালী আফরোজ বলেন, জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সড়কটি এখন চলাচলের অনুপযোগী। এ ছাড়া আশুরির হাট-গোলাবাড়ি, নয়াহাট-গোলাবাড়ি, পাগলা-সাবুপুরা সড়কসহ ৭-৮টি সড়কের বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় গর্ত। এ কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধের পথে।
আদাবাড়িয়া ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলেয়া বেগম তালুকদারের ভাষ্য, তাঁর ইউনিয়নের গোলাবাড়ি-হাজির হাটসহ ৪-৫টি সড়ক ধসে গেছে। এতে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব সড়ক মেরামতের দাবি জানান তিনি।
চন্দ্রদ্বীপ ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল বশার জানান, ছোট-বড় কয়েকটি চর নিয়ে গঠিত ইউনিয়নের চারদিকে তেঁতুলিয়া নদী। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানির তোড়ে বেড়িবাঁধ ও পাকা সড়কের বিটুমিন উঠে গেছে। যে কারণে খোয়া-পাথর সরে বড় গর্ত হয়েছে। কোথাও সড়কের অংশ ধসে গেছে। যানবাহন চলাচলের উপায় নেই।
এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী আরজুল হক বলেন, টানা বর্ষণে গ্রামীণ সড়কগুলোর বেশ ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের তালিকা করে প্রাক্কলন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠাবেন। কাঁচা সড়ক, পাকা সড়ক ও বেরিবাঁধের সংস্কারে প্রায় ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন। বরাদ্দ এলেই সংস্কার শুরু করবেন।
বাউফলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহম্মেদ বলেন, জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে সড়কের বিষয়ে তথ্য পেয়েছেন। যেসব সড়ক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোতে ইট-বালু ফেলে সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
ভারী যানে ভেঙেছে সড়ক
কুষ্টিয়ার কুমারখালী শহর থেকে পান্টি বাজার পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কটি যেন আর সড়ক নেই। অসংখ্য ছোট বড় খানাখন্দে ভরা। কোথাও আবার বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ছোটখাটো পুকুর। ভাঙা সড়কে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। তবুও জরুরি প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যদুবয়রা, পান্টি, চাঁদপুর ও বাগুলাট ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ।
স্থানীয় লোকজন ও এলজিইডির কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালে সড়কটি পুনঃসংস্কার করে এলজিইডি। এই সড়ক দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ টন ওজনের যানবাহন চলার কথা থাকলেও দিনে
২৫-৩০ টন ওজনের শতশত বালুবাহী ড্রাম ট্রাক ও ভারী যান চলাচল করে। এতে চার বছরের মাথায় সড়কের দশা নাজুক।
গত বৃহস্পতিবার সকালে দেখা যায়, সড়কের যদুবয়রা জয়বাংলা বাজার মোড়, যদুবয়রা পশুহাটের সামনে, জোতমোড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এলাকায় বড় বড় গর্ত। সেখানে পানি জমে আছে। ছোটবড় খানাখন্দের সংখ্য অসংখ্য। বালুবাহী ১০ চাকার ট্রাক ও ড্রাম ট্রাক চলাচলের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ছোট যানবাহনগুলো।
জোতমোড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহমুদ শরীফ বলেন, অনেকদিন হলো বিদ্যালয়ের সামনে বড় গর্ত। বৃষ্টি হলেই পানি জমে পুকুর হয়ে যায়। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের পোশাক ভিজে যায়।
যদুবয়রা গ্রামের ভ্যানচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, সারা রাস্তাই ভাঙা, ছোট বড় অনেক গর্ত। বৃষ্টি হলেই কাদা-পানির পুকুর হয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই গাড়ি উল্টে যাচ্ছে। রাস্তার তুলনায় অতিরিক্ত ওজনের বালুর গাড়ি যাচ্ছে।
উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. নাজমুল হকের ভাষ্য, ১০ টন ধারণ ক্ষমতার গ্রামীণ সড়কে ২৫-৩০ টন ওজনের যানবাহন চলাচল করছে। এ কারণে সংস্কারের চার বছরের মাথায় আবারও সড়কটি ভেঙে পড়ছে। অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধে প্রশাসনকে বলা হবে। আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ পেলে সড়কটি সংস্কার করা হবে।
- বিষয় :
- সড়ক