ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

কৃষক কার্ড হবে সরকারি সহায়তা পাওয়ার মূল ভিত্তি: ডিএই মহাপরিচালক

চার দিনেই সাড়ে ৪ লাখ কৃষকের তথ্য সংগ্রহ

কৃষক কার্ড হবে সরকারি সহায়তা পাওয়ার মূল ভিত্তি: ডিএই মহাপরিচালক
×

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ১৯:১৭

সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচি ‘কৃষক কার্ড’ বাস্তবায়নে দ্রুত এগোচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। কর্মসূচির আওতায় তথ্য সংগ্রহ শুরুর মাত্র চার দিনেই প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ৫ হাজার ৫০০ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কোবো টুলস ব্যবহার করে এই তথ্য সংগ্রহ করছেন। ডিএই বলছে, কৃষক কার্ড চালু হলে সরকারি প্রণোদনা, কৃষিঋণ, বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কৃষকেরা অগ্রাধিকার সুবিধা পাবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বুধবার গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, কৃষক কার্ড বর্তমানে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি। এর পাইলট কার্যক্রম ইতোমধ্যে সফলভাবে শেষ হয়েছে। এখন দেশের ৫০৩টি ব্লকে কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ চলছে। এই কার্যক্রম সরাসরি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

মো. আব্দুর রহিম বলেন, তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ৫ হাজার ৫০০ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে কোবো টুলস ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহের ফলে কাজের গতি বেড়েছে। মাত্র চার দিনেই প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, কৃষক কার্ড শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; ভবিষ্যতে কৃষকের জন্য সরকারি সেবার কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এটি কাজ করবে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়েও কথা বলেন ডিএই মহাপরিচালক। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রথমেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন বলে জানান। এ জন্য দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ২০ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে প্রধান কার্যালয় পর্যন্ত সবার জন্য নিয়মিত তদারকি, জবাবদিহিতা এবং কৃষকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন এবং কৃষকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের কার্যক্রমের মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি বীজ, সার ও ডিজেল বিতরণে আর্থিক বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণ এবং সার, কীটনাশক ও সেচ ব্যবস্থাপনার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

দুর্নীতির বিষয়ে অধিদপ্তরের অবস্থান তুলে ধরে মো. আব্দুর রহিম বলেন, অনিয়মের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে শাস্তিমূলক বদলিসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, কৃষকই দেশের প্রাণ। তাই তাঁদের সমস্যার সমাধানে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে।

প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। তাঁর মতে, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে কর্মকর্তাদের ই-জিপি ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ২৯টি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন উইংয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে নিয়মিত সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের বিষয়েও কথা বলেন ডিএই মহাপরিচালক। তিনি জানান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার—এই সাত জেলায় কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ৩২০ মেট্রিক টন উন্নত জাতের ধানবীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি জমিতে বীজতলা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কৃষকেরা দ্রুত চারা পান। বিনা মূল্যে গাছের চারা, জৈব সার ও প্রয়োজনীয় খুঁটিও দেওয়া হচ্ছে।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে চলতি বছর ডিএই ২৫ লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্য নিয়েছে। এরই মধ্যে ১৯ লাখের বেশি গাছ রোপণ করা হয়েছে। প্রতিটি গাছ জিও-ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে রোপণের পাশাপাশি গাছের টিকে থাকাও নিশ্চিত করা যায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অঞ্চলভিত্তিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে অধিদপ্তর। মো. আব্দুর রহিম বলেন, হাওর অঞ্চলে আগাম ও ঠান্ডা সহনশীল ব্রিধান-১১৮ এবং বন্যা ও লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতের কৃষিকে টেকসই করতে সোলার সেচব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং এগ্রো-প্রসেসিং জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তিনি বলেন, কৃষির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ফসল কাটার পর ক্ষতি কমানো, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো। এ জন্য মিনি কোল্ডস্টোরেজ বিতরণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসনের নৈতিক মান উন্নয়ন এবং মাঠপর্যায়ে কৃষকের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×