ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এএসএলডিবি, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস ও সমকাল গোলটেবিল

হেপাটাইটিস নির্মূলে সর্বজনীন পরীক্ষা ও টিকাদানের তাগিদ

জনসচেতনতা সৃষ্টি, দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতা বাড়ানোয় জোর

হেপাটাইটিস নির্মূলে সর্বজনীন পরীক্ষা ও টিকাদানের তাগিদ
×

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টাইমস মিডিয়া ভবনের সমকাল কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ‘ হেপাটাইটিস জানুন, পরীক্ষা করুন, চিকিৎসা নিন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা - সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ১৭:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। হেপাটাইটিসজনিত মৃত্যুর দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি বাংলাদেশ। এমন বাস্তবতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক সর্বজনীন স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করে সবাইকে পরীক্ষা করা এবং টিকা ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

এ ছাড়া জনসচেতনতা বাড়ানো, দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতা বাড়ানোয় জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত ‘হেপাটাইটিস জানুন, পরীক্ষা করুন, চিকিৎসা নিন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন লিভার বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা। অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অব লিভার ডিজিজেস বাংলাদেশ (এএসএলডিবি), পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি ও সমকাল যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।

হেপাটাইটিস পরিস্থিতি 
বৈঠকে হেপাটাইটিস দিবসের ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে মূল বক্তব্য দেন এএসএলডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বারডেম জেনারেল হাসপাতালের লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম আযম। তিনি বলেন, ভাইরাল হেপাটাইটিস এখনও বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর হেপাটাইটিস বি ও সি’জনিত লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারে ১০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হলেও রোগ দুটি পুরোপুরি প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ও এর টিকার আবিষ্কারক নোবেলজয়ী অধ্যাপক বারুচ এস. ব্লামবার্গের জন্মদিনকে স্মরণ করে ২০১০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২৮ জুলাইকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। 

অধ্যাপক গোলাম আযম আরও বলেন, এ বছরের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো–দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসার আওতা বাড়ানো এবং নতুন সংক্রমণ প্রতিরোধ। বাংলাদেশে শিশুর জন্মের সময় হেপাটাইটিস বি টিকা প্রদান শতভাগ নিশ্চিত করা, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা এবং নিয়মিত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে রোগটি নির্মূল করা সম্ভব।

সংক্রমণের চিত্র ও সামাজিক বিভ্রান্তি
এএসএলডিবির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন বলেন, ২০০৩ সালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) হেপাটাইটিস বি টিকা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর দেশে সংক্রমণ হার ১৯৯৪ সালের ৯.৭ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৫.১ শতাংশে নেমে এসেছে। তবুও দেশে এখনও প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত। 

তিনি বলেন, এ বছরের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্য– আমাদের ভয়, ভ্রান্ত ধারণা, সামাজিক সংস্কার ও তথ্যের ঘাটতি দূর করার আহ্বান জানায়। স্পর্শ বা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়ায় এটি ছড়ায় না। মানুষ যত বেশি সচেতন হবে, তত বেশি পরীক্ষার আওতায় আসবে। তিনি বলেন, হেপাটাইটিস বি পজিটিভ ব্যক্তিদের চাকরির অযোগ্য ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

অন্তঃসত্ত্বা ও শিশুর সুরক্ষায় স্ক্রিনিং
ঢাকা মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের প্রধান ও এএসএলডিবির যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ডা. এ বি এম শাকিল গনি বলেন, দেশে সন্তান জন্মদানে সক্ষম প্রায় ১৮ লাখ নারী হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত। তবে তাদের অধিকাংশই এটি জানেন না। সব অন্তঃসত্ত্বা নারীর হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে মা থেকে শিশুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। 

সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, ১৯ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে টিকা দেওয়া সত্ত্বেও মাত্র ২৮ শতাংশের শরীরে পর্যাপ্ত সুরক্ষা রয়েছে এবং প্রতি ২০০ জনে একজন হেপাটাইটিস বি-পজিটিভ। তাই শুধু টিকার ওপর নির্ভর না করে সর্বজনীন স্ক্রিনিং জরুরি। 

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ হেপাটাইটিস এ-তে আক্রান্ত। তাই এর টিকাকেও জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

সময়মতো প্রতিরোধের গুরুত্ব
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও এএসএলডিবির অর্থ সম্পাদক ডা. মো. শাহেদ আশরাফ সেতু বলেন, হেপাটাইটিস শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি পরিবারের জন্য বড় অর্থনৈতিক বোঝা। বাংলাদেশে চিকিৎসা খরচের বড় অংশই রোগীদের বহন করতে হয়। হেপাটাইটিস বি রোগীর আজীবন চিকিৎসা ও জটিলতার ব্যয় কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে তুলনামূলক অল্প খরচে টিকা ও সময়মতো পরীক্ষার মাধ্যমে এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি ও অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে পরিবারগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব। 

ছড়ানোর মাধ্যম
এএসএলডিবির যুগ্ম সম্পাদক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, হেপাটাইটিস এ ও ই সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। হেপাটাইটিস বি ও সি ছড়ায় সংক্রমিত রক্ত, অপরিষ্কার সুচ ও অরক্ষিত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে। 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ এবং জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে কার্যকর চিকিৎসার মাধ্যমে হেপাটাইটিস সি সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব এবং হেপাটাইটিস বি দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

দেশীয় সক্ষমতা ও ভ্যাকসিনের গুরুত্ব 
পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মো. আহসানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে এখন দেশীয় প্রযুক্তিতেই হেপাটাইটিস বি-এর ভ্যাকসিন উৎপাদন করা হচ্ছে, যা প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রাখছে। তবে ২০০৫ সালের আগে জন্ম নেওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষ টিকার সুরক্ষার বাইরে রয়েছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের স্ক্রিনিং করে তাঁদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন।

সুলভ চিকিৎসা ও নির্মূলের রূপরেখা
বৈঠকে এএসএলডিবির সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, হেপাটাইটিস বি ও সি’র প্রয়োজনীয় সব ধরনের আধুনিক চিকিৎসা এখন দেশেই হচ্ছে। অন্য দেশের তুলনায় অনেক কম মূল্যে এসবের ওষুধ বাংলাদেশে সহজলভ্য। 

মিসর ও তাইওয়ানের সফলতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক (এনআইডি) স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করে সবাইকে পরীক্ষা করা এবং সংক্রমণমুক্ত ব্যক্তিদের টিকার আওতায় আনা গেলে ২০৩০ সালের আগেই বাংলাদেশকে হেপাটাইটিসমুক্ত করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

×