হবিগঞ্জে ঢুকতে পারেননি এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা
জেলা ছাত্রদল সভাপতিসহ ১১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জে যাওয়ার পথে রশিদপুর এলাকায় পুলিশের আরেক দফা বাধা পেয়ে সড়কে বসে পড়েন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা। গতকাল বুধবার বিকেলে -সমকাল
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৩ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
হবিগঞ্জে গত মঙ্গলবার এনসিপির পদযাত্রায় হামলার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। হামলায় আহত হন দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। এর প্রতিবাদে এনসিপি সমাবেশ ডাকলে ছাত্রদল একই স্থানে সমাবেশ ডাকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিতে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নেতারা হবিগঞ্জ যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে তারা বাহুবল থেকে মৌলভীবাজার ফিরে যান।
এদিকে এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে সমাবেশ চলাকালে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপিকর্মীদের বিরুদ্ধে। পরে দুপক্ষে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সিলেটে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি ও ফেনীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে দলটি।
মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জ আসার পথে বাহুবল উপজেলায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহর আটকে দেয় পুলিশ। প্রায় চার ঘণ্টা পর রাত ৮টার দিকে কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে বসে সদর থানায় মামলা করে এনসিপি। মামলায় হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল সভাপতি শাহ রাজীব আহমেদ রিংগনসহ ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ জনকে আসামি করা হয়। মামলার বাদী হন জেলা যুবশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তানভীর রুয়েল। পরে রাত ৯টার দিকে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা মৌলভীবাজারের দিকে রওনা দেন।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম অভিযোগ করে বলেন, বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে তাদের গাড়িবহর পুলিশ আটক করে রাখে। সন্ধ্যা ৭টায় শুধু মামলা করতে হবিগঞ্জ থানায় যেতে চাইলেও পুলিশ বাধা দেয়। এক পর্যায়ে রাত ৮টায় বাহুবলের কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে বসে মামলা দিতে বাধ্য হন। পুলিশ বিএনপি সরকার ও তাদের নেতাকর্মীদের সহযোগিতা করতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে বাধা দিয়েছে।
এদিকে কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনেই বিক্ষোভ করেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া বিকেলে হবিগঞ্জ শহরে জেলা বিএনপির কার্যালয়ে প্রতিবাদ সভা করে জেলা যুবদল।
পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ বলেন, এনসিপি ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। এনসিপি নেতারা হবিগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে ১৪৪ ধারা ভেঙে সভা করতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা দেখা দেয়। তাদের নিরাপত্তা ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কামাইছড়ায় অবস্থান নেয়।
মৌলভীবাজারে পুলিশের বাধা
মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জ যাওয়ার পথে শ্রীমঙ্গলের চা-কন্যা নামক স্থানে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন এনসিপির নেতারা। পরে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে হবিগঞ্জের দিকে যান তারা।
পুলিশ ও এনসিপি জানায়, মঙ্গলবার হবিগঞ্জে জুলাই পদযাত্রার কর্মসূচি শেষে মৌলভীবাজারের উদ্দেশে রওনা হন এনসিপির নেতারা। পথে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হওয়ার পর রাতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ কয়েকজন নেতা মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসে এসে রাতযাপন করেন। বুধবার সকালে ঢাকা থেকে মৌলভীবাজারে আসেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ অনেক নেতা। মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জে প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিতে বিকেল ৪টার দিকে রওনা দেন তারা।
পুলিশ জানায়, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ, মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এনসিপির নেতাদের প্রতিহত করতে অবস্থান নেন। দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এড়াতে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের একটি দল সেখানে অবস্থান নিয়ে তাদের বাধা দেয়। একই সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি মৌলভীবাজারে পালনের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু তারা জেলা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে হবিগঞ্জ শহরের উদ্দেশে রওনা দেন।
চট্টগ্রামে এনসিপি ও বিএনপির নেতাকর্মীদের হাতাহাতি
চট্টগ্রামে এনসিপি ও বিএনপির নেতাকর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। বিকেলে নগরের চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রেস ক্লাবের আশপাশের দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দ্রুত বন্ধ করে দেন মালিকরা। কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে যায় প্রেস ক্লাবের সামনের ব্যস্ততম সড়কে যান চলাচল। এদিকে রাতে মশাল মিছিল করেন এনসিপির নেতাকর্মীরা।
সিলেটে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
এনসিপির দাবি, রাজনৈতিক দলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে হবিগঞ্জে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের শাস্তি এবং আজ বৃহস্পতিবার ও আগামীকাল শুক্রবারের পদযাত্রা কর্মসূচিতে নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়েছে। গতকাল সিলেট নগরীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান এনসিপি সিলেট জেলার আহ্বায়ক মো. জুনেদ আহমদ।
ফেনীতে বিক্ষোভ সমাবেশ
হবিগঞ্জে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার প্রতিবাদে ফেনীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। সমাবেশে ফেনী জেলা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব মুহাইমিন তাজিমের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন জেলা এনসিপির আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম সৈকত, সদস্য সচিব শাহ ওয়ালি উল্লাহ মানিক, জেলা যুবশক্তির সদস্য সচিব জাহিদ হোসেন, জেলা ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক সোহরাব হোসেন ও প্রিন্স মাহমুদ আজিম।
জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের প্রতিবাদ
এনসিপির কর্মসূচির গাড়িবহরে হামলা এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের হেনস্তার প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে বিরোধী দলের ওপর সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিয়েছে সরকার। বিএনপির হামলাকারী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেছে জামায়াত।
গতকাল বিবৃতিতে এসব কথা বলেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ।
বাংলাদেশ খেলাফতের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ বিবৃতিতে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ‘পরিণতি’ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এনসিপির ওপর হামলার নিন্দা করেছেন।
নেজামে ইসলামের ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী ও মহাসচিব মূসা বিন ইযহার বলেছেন, রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে হামলা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের আশ্রয় নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
১১ দলের কর্মসূচি থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিয়েছেন।
জমিয়তের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, ছাত্রশিবির সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।
সিলেটের ৫ উপজেলায় বিজিবি মোতায়েন চেয়ে চিঠি
সিলেটের পাঁচ উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করার অনুরোধ জানিয়ে জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিজিবি সদরদপ্তরে চিঠি দিয়েছেন। পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. যাবের সাদেকের জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আজ ও আগামীকালের জন্য বিজিবি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। জৈন্তাপুর, গোলাপগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে দুই দিন বিজিবি মোতায়েনের পরিকল্পনা আছে। সিলেটে আজ ও আগামীকাল এনসিপির পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
তবে পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. যাবের সাদেক সমকালকে জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী তিনটি উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাটে সন্ধ্যায় কর্মসূচি থাকায় সহায়ক হিসেবে তিনি বিজিবি চেয়েছেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথাও বলেছেন। তারা সহনশীল আচরণের কথা বলেছেন।
(ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য)