অভিবাসনের স্বপ্ন
পর্দায় তার অন্ধকার পথ
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১১:৪৭ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১১:৫৭
বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন অনেকের কাছে নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই কখনও অপেক্ষা করে প্রতারণা, দালালচক্র, অনিশ্চিত নৌযাত্রা কিংবা মৃত্যুর ফাঁদ। উত্তাল সমুদ্রে কাঠের নৌকায় দিনের পর দিন না খেয়ে থাকা, অসুস্থ মানুষকে সাগরে ফেলে দেওয়া, সর্বস্ব হারিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা– অভিবাসনের এমন নির্মম বাস্তবতাই উঠে এসেছে ‘মাইগ্রেশন ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬’-এর চলচ্চিত্রগুলোতে।
বাংলাদেশের প্রথম অভিবাসন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানবিষয়ক চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতা ও উৎসবটির জাতীয় বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে আবির ফেরদৌস মুখরের ‘হাউ ডু ইউ ডু’। আন্তর্জাতিক বিভাগে সেরা হয়েছে তুরস্কের পরিচালক আদার বারান ডেগারের ‘দ্য কোল্ড’। গতকাল বুধবার আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
জাতীয় বিভাগে দ্বিতীয় হয়েছে সৈয়দ সাহিল ও রাকায়েত রাব্বীর ‘মাটি’ এবং তৃতীয় হয়েছেন ইফফাত রওনাক প্রমির ‘দ্য লাস্ট প্যাসেজ’। আন্তর্জাতিক বিভাগে দ্বিতীয় হয়েছেন ইরানের পরিচালক মোসায়েব হানাইয়ের ‘ওভারলোড’ এবং তৃতীয় হয়েছে ভেনেজুয়েলার পরিচালক রিকার্দো মুনোজ সিনিয়রের ‘অ্যান আইল্যান্ড’।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এমপি বলেন, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান। যাওয়ার আগে ও পরে তাদের অনেকে প্রতারণার শিকার হন। অথচ তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিবাসন প্রক্রিয়াকে সুশৃঙ্খল করার পাশাপাশি বিদেশ যেতে ইচ্ছুক মানুষের জন্য সহজ ও নিরাপদ পথ তৈরি এবং ব্যয় কমানো জরুরি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইফুল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়ার পথে যেমন আশার গল্প রয়েছে, তেমনি রয়েছে দুঃখ ও বঞ্চনার কাহিনি। নির্মাতারা সেই বাস্তব গল্পগুলোই চলচ্চিত্রে তুলে এনেছেন।
বাংলাদেশে ইতালি দূতাবাসের মাইগ্রেশন অ্যাটাশে জিওসেপ্পে দি জিওভান্নি বলেন, ইতালি যেতে ১০ থেকে ১৫ হাজার ডলার খরচ হয় বলে অনেকের ধারণা থাকলেও ভিসা ফি সর্বনিম্ন ৬১ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ ডলার। মাঝের বিপুল অর্থের বড় অংশ নেয় দুই দেশের কিছু অপরাধী চক্র। এসব চক্র ভাঙতে বাংলাদেশের সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।
চলচ্চিত্র নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন বলেন, শিল্প ও গল্প বলার শক্তি কাজে লাগিয়ে অভিবাসন নিয়ে আরও গভীর সামাজিক আলোচনা তৈরি করা সম্ভব। আর আইএলওর ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও জুরি সদস্য রাহনুমা সালাম খান বলেন, মানব পাচার ও অভিবাসনের মতো জটিল মানবিক সংকটকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম।
স্বাগত বক্তব্যে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে যাওয়া এবং বঙ্গোপসাগর হয়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। প্রতারণার শিকারও হচ্ছেন অনেকে। এসব বাস্তবতা সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিই উৎসবের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের সহযোগিতায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ‘ম্যাস ক্যাম্পেইন টু কমব্যাট হিউম্যান ট্র্যাফিকিং অ্যান্ড পিপল স্মাগলিং’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে উৎসবটি আয়োজন করা হয়। গত ১ এপ্রিল চলচ্চিত্র আহ্বানের পর বিশ্বের ২৪টি দেশ থেকে জমা পড়ে এক হাজারের বেশি চলচ্চিত্র। ছয়টি মেন্টরশিপ কর্মশালার পর প্রাথমিকভাবে ৫৭টি চলচ্চিত্র বাছাই করা হয়। এর মধ্যে জাতীয় বিভাগের ১৩টি ও আন্তর্জাতিক বিভাগের ১০টিসহ ২৩টি চলচ্চিত্র চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় স্থান পায়।
জুরি হিসেবে ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিমেল আশরাফ, রাহনুমা সালাম খান এবং সিনেমাটোগ্রাফার ও পরিচালক সাহিল রনি। চিত্রনাট্য, নির্মাণশৈলী, বিষয়বস্তুর প্রাসঙ্গিকতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় বিজয়ীদের নির্বাচিত করা হয়।
সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পাওয়া আবির ফেরদৌস মুখরের প্রত্যাশা, মানুষ তাঁর মতো নির্মাতাদের চলচ্চিত্র দেখে অন্তত একবার ভাববে, কোন পথে গেলে নিরাপদ থাকা যায়, আর কোন পথে রয়েছে মৃত্যুফাঁদ।
- বিষয় :
- অভিবাসন
- ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল