ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লুণ্ঠন ও ধান্ধাবাজির অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী ধারায় আনতে হবে

লুণ্ঠন ও ধান্ধাবাজির অর্থনীতিকে  উৎপাদনমুখী ধারায় আনতে হবে
×

 সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়েছে ডলারে। টাকাকে ডলারে নিয়ে পাচার করা হয়। টাকা দেশের মধ্যেই রয়েছে– যা মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি করছে। এ ছাড়া আছে চাঁদাবাজি। পুলিশ ও রাজনৈতিক পেশিশক্তির লোকজনকে চাঁদা না দিয়ে কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষে ব্যবসা করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। লুণ্ঠন ও ধান্ধাবাজির এই অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী ধারায় ফেরাতে হবে। একইসঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটাতে নীতি কৌশল নিতে হবে সরকারকে।

‘অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জ: আগামীর অগ্রাধিকার’ বিষয়ক এক সেমিনারে এসব কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তারা। 
গতকাল বুধবার ইকনোমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) রাজধানীর পল্টনে নিজস্ব মিলনায়তনে এ আয়োজন করে। 
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অর্থনীতি সমিতির সভাপতি, জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রশাসক ফজলুল হক। ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো সম্পর্ক বা দায় নেই। পতিত সরকারের নেওয়া জ্বালানিতে আমদানি নির্ভরতা, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান না করা ও নিজেদের লোকজনকে এ খাতে লুটপাটের সুযোগ দেওয়ার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ 
নিয়ে সময়মতো উদ্যোগ নিলে জ্বালানির সংকট তৈরি হতো না। 

উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকার শুধু অতীতে সৃষ্ট সমস্যা মোকাবিলা করছে না, ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কাজ করছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং চার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে। 

মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, লুটপাট, দুর্নীতি এবং আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার নানা অনিয়মের কারণে অতীতে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের সামান্য বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে তা ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে এবং এটা অর্জন করা সম্ভব। 
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর জন্য অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে– এমন প্রশ্নের জবাবে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আগামীতে রাজস্ব বাড়বে। সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে কর ফাঁকি রোধ, আয়কর ও ভ্যাট বাড়াতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে বিভিন্ন খাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক কিংবা কোনো টাস্কফোর্সের পরামর্শে রাজস্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হবে না; বরং সরকারের নিজস্ব কায়দায় কাজটি করা হবে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের রাজস্ব আদায়ের হিসাব নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বসা হবে। সেখানেই প্রমাণ হবে সরকারের কথায় এবং কাজের কতটা মিল কিংবা অমিল। 

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়েছে ডলারে। টাকাকে ডলারে নিয়ে পাচার করা হয়। টাকা দেশের মধ্যেই রয়েছে– যা মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি করছে। এ ছাড়া আছে চাঁদাবাজি। পুলিশ ও রাজনৈতিক পেশিশক্তির লোকজনকে চাঁদা না দিয়ে কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষে ব্যবসা করা সম্ভব হচ্ছে না। চাঁদাবাজিও এক ধরনের কর। যে কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এখানে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। লুট ও পাচারের অর্থনৈতিক কাঠামা বদলাতে না পারলে কোনো সংস্কারই কাজে আসবে না। লুণ্ঠনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক মডেল থেকে সরে এসে দ্রুত উৎপাদনমুখী ও টেকসই অর্থনৈতিক ধারায় ফিরতে হবে। এ উদ্দেশ্যে এ নীতি কৌশল নিতে হবে সরকারকে।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেলেও উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি খাতে এখনও তীব্র অস্বস্তি বিদ্যমান। অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা কাটাতে কাঠামোগত ও গভীর সংস্কারের বিকল্প নেই। জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা আর কতদিন চলবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। অর্থনীতির দুর্বলতা কাটাতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ফজলুল হক বলেন, বিদ্যমান গভীর জ্বালানি সংকটের মধ্যেও দেশের রপ্তানি খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা শিল্প উদ্যোক্তাদের বড় সাফল্য। তবে শিল্প চালু রাখতে কারখানা মালিকদের অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে, বিকল্প হিসেবে চালাতে হচ্ছে ডিজেল ও জেনারেটর। গ্যাসের সংকট দূর করে শিল্পে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তিনি জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ থাকা কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালুর পরামর্শ দেন তিনি। 

আরও পড়ুন

×