ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দুই আড়তের ৬ কোটি টাকা নয়ছয়

দুই আড়তের ৬ কোটি টাকা নয়ছয়
×

শাহাপুর মৎস্য আড়তের ফ্লোর উঁচু করার কথা থাকলেও তা হয়নি সমকাল

এম এ এরশাদ, ডুমুরিয়া (খুলনা) 

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

নির্মাণ হওয়ার কথা ছিল স্বাস্থ্যসম্মত ও উন্নতমানের আধুনিক দুটি মৎস্য আড়ত। এ জন্য ছয় কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৪ টাকা বরাদ্দ ছিল। অভিযোগ উঠেছে, মৎস্য কর্মকর্তার সহায়তায় পুরাতন আড়ত দুটি ঘষেমেজে পুরো টাকা তুলে নিয়েছে ঠিকাদার। এ ছাড়া তিনটি নদী ও খালে অভয়াশ্রম স্থাপন, তিনটি বিল নার্সারি স্থাপন, ১৩টি মাছের খামার প্রদর্শনী স্থাপন এবং অফিস মেরামতের জন্য ব্যয় দেখিয়েও অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্টের’ আওতায় উপজেলার শাহাপুর ও চুকনগর এলাকায় দুটি স্বাস্থ্যসম্মত ও উন্নতমানের আধুনিক মৎস্য আড়ত নির্মাণে উদ্যোগ নেয় সরকার। প্রকল্প পরিকল্পনায় এই টাকা দিয়ে শাহাপুর মৎস্য আড়তে ৯টি এবং চুকনগর মৎস্য আড়তে ১৮টি প্যাকেজে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করার কথা ছিল। বাস্তবে পুরোনো আড়ত ঘষামাজা করে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হয়েছে। 

চুকনগর মৎস্য আড়ত আধুনিকায়নে তিন কোটি ৬৭ লাখ ২৮ হাজার ৬৭৯ টাকা এবং শাহাপুর মৎস্য আড়ত নির্মাণে দুই কোটি ৪২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। 
গত মঙ্গল ও সোমবার সরেজমিন দেখা গেছে, চুকনগর মৎস্য আড়তের ১৮টি প্যাকেজের মধ্যে আড়তের ফ্লোর উচ্চতা বৃদ্ধিতে ২৭ লাখ ৪৯ হাজার ৭৬০ টাকা, ইটিপি স্থাপনের ২৪ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭৫ টাকা, বরফ কল নির্মাণে ২৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে কোনো কাজ না করেই। এ ছাড়া গেট ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ প্যাকেজে ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৩২৯ টাকা বরাদ্দ থাকলেও এখানে শুধু গেট নির্মাণ করা হয়েছে। সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়নি। 
অন্যান্য প্যাকেজের মধ্যে ওয়াসরুম নির্মাণে ১৮ লাখ ২৭ হাজার টাকা, আড়তের ছাদের সিলিংয়ের জন্য ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, আড়তের বিভিন্ন উন্নয়নের জন্য ২৯ লাখ ১৫ হাজার ৭১৮ টাকা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও আরসিসি রাস্তা নির্মাণে ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৩১৩ টাকা, আড়তের সেট নির্মাণে ২৪ লাখ ৫৫ হাজার ৬৮২ টাকা ব্যয় ধরা হয়। এসব প্যাকেজে নামকাওয়াস্তে কাজ করে পুরো টাকা খরচ দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্পে দুর্নীতি-অনিয়মের বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথার পরামর্শ দিয়ে চুকনগর মৎস্য আড়ত নির্মাণ প্রকল্পের সভাপতি আনিচুর রহমান বলেন, ‘মৎস্য অফিসের পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে কাজ করানো হয়েছে। মৎস্য দপ্তর সম্পূর্ণ কাজ বুঝে নিয়েছে। শুধু চেকে স্বাক্ষর করেছেন তিনি।’
অপরদিকে উপজেলার শাহাপুর মৎস্য আড়ত নির্মাণে ৯টি প্যাকেজের মধ্যে প্রাক্কলন অনুযায়ী ফ্লোর উচ্চতা বৃদ্ধি ও ওয়াসরুম নির্মাণ করা হয়নি। অথচ এই খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৯ লাখ ৯৪ হাজার ৭০ টাকা। আড়তের জন্য বরফ কল নির্মাণ না করেই এই প্যাকেজের ২৯ লাখ ৮৫ হাজার ১১৫ টাকা তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের অপর প্যাকেজগুলোতে নামকাওয়াস্তে কাজ করে মৎস্য কর্মকর্তার সহায়তায় পুরো অর্থ তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার। 

আড়তে বরফ কল না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে ওই এলাকার বাসিন্দা সত্য প্রসাদ বিশ্বাস জানান, আড়তের নিজস্ব কোনো বরফ মিল নেই। যে বরফ কলটি আছে সেটির মালিক তিনি। 
এ ব্যাপারে শাহাপুর মৎস্য আড়তের ভাই-বন্ধু মৎস্য আড়তের মালিক ও আড়ত নির্মাণ প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার সবুর বলেন, ‘মৎস্য বিভাগের পছন্দের ঠিকাদার আড়ত নির্মাণের কাজটি করেছে। শিডিউল অনুযায়ী কাজ বুঝে দেওয়া হয়নি। সরকারি বরাদ্দের অর্থ-পুরোনো আড়ত ঘষামাজা ও লোক দেখানো সংস্কার দেখিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হয়েছে। এখন নিজেদের পকেট থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ করে ওয়াস রুমটি করতে হচ্ছে।’ 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চুকনগর ও শাহাপুর মৎস্য আড়তের একাধিক মালিক সমকালকে বলেন, কোটেশনের মাধ্যমে প্রকল্প দুইটি বাস্তবায়ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট আড়ত মালিকদের মধ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাংক হিসাবও তাদের নামে ছিল। বাস্তবে প্রকল্প কমিটির কাজ ছিল শুধু চেকে স্বাক্ষর করা। কাজের অস্তিত্ব ও মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে টাকা তুলে নেন ঠিকাদার। 

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সোয়েল মো. জিল্লুর রহমান রিগানের ভাষ্য, মৎস্য আড়ত নির্মাণ প্রকল্পে তেমন কোনো দুর্নীতি হয়নি। নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন তারা। কাজ বুঝেও নিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া অভয়াশ্রম, বিল নার্সারি, প্রদর্শনী খামার ও অফিস মেরামতের কাজ ঠিকঠাক মতো করা হয়েছে। একটি মহল তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, দুই মৎস্য আড়ত নির্মাণে বিভিন্ন প্যাকেজের কাজে ঠিকাদার ছিলেন খুলনা জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী, ডুমুরিয়া উপজেলার বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব সরদার আব্দুল মালেক, আটলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দিন ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি অ্যাড. মনিমুর রহমান নয়ন।
ঠিকাদার ও জেলা বিএনপি নেতা মনিরুল হাসান বাপ্পী জানান, শাহাপুর মৎস্য আড়ত নির্মাণ প্রকল্পের ছাউনিসহ মাত্র দুই-তিনটি প্যাকেজের কাজ করেছেন তিনি। নিয়ম মেনেই কাজ হয়েছে, কোনো অনিয়ম হয়নি। 
বিএনপি নেতা সরদার আব্দুল মালেক বলেন, ‘চুকনগরে শিডিউল অনুযায়ী নিয়ম মেনে কাজ হয়েছে। কাজে কোনো ত্রুটি হয়নি। কাজ বুঝে নিয়েই তো মৎস্য কর্মকর্তা বিল টাকা ছাড় দিয়েছেন।’ 
অপর ঠিকাদার ইউপি চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘অর্থ বরাদ্দ কম থাকায় চুকনগরে বরফ মিল নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। এই টাকা অন্যত্র চলে গেছে। অন্যান্য কাজ ঠিকঠাক মতো করা হয়েছে।’ 
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, মৎস্য আড়ত নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তিনি এখানে দায়িত্বে ছিলেন না। এ কারণে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা না থাকায় কিছু বলতে পারছেন না। এ ছাড়া মাছের অভয়াশ্রম, বিল নার্সারি, অফিস মেরামতের অর্থ ও প্রদর্শনী খামার স্থাপনাগুলোতে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হলে সরেজমিন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

আরও পড়ুন

×