ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মমেক হাসপাতাল

লিফট অচল রেখে কোটি টাকা আত্মসাৎ, রোগীদের ভোগান্তি

লিফট অচল রেখে কোটি টাকা আত্মসাৎ, রোগীদের ভোগান্তি
×

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল

 তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৩ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগে রোগী আসেন প্রায় চার হাজার। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আসা-যাওয়া করেন দুই-তিনজন স্বজন। এই হিসাব অনুযায়ী, হাসপাতালটিতে প্রতিদিন ১৬ থেকে ২৪ হাজার মানুষের আনাগোনা হয়। তাদের জন্য লিফট আছে ১৫টি। কিন্তু এগুলোর অর্ধেকের বেশিই বিকল। এতে রোগী ও তাদের স্বজনের ওঠানামায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। 

অভিযোগ উঠেছে, এই ভোগান্তির পেছনে রয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর ময়মনসিংহ অফিসের অসাধু প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নাঈমা এন্টারপ্রাইজের যোগসাজশে লিফট রক্ষণাবেক্ষণ ও অপারেটর নিয়োগের নামে অনিয়ম। তারা এই খাতে প্রতিবছর কোটি টাকা আত্মসাৎ করছেন।

 ১৫ লিফটের অর্ধেকের বেশিই বিকল
হাসপাতালটি দুটি ভবনে বিভক্ত। চারতলা পুরোনো ভবন এবং ৯ তলা নতুন ভবন। এ দুই ভবনে ১৫টি লিফট আছে। এ ছাড়া মেডিকেল কলেজ, শিক্ষার্থী ও নার্সিং হোস্টেল মিলিয়ে আরও ছয়টিসহ পুরো ক্যাম্পাসে মোট লিফট রয়েছে ২১টি।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, হাসপাতাল ভবনের ১৫টি লিফটের মধ্যে অধিকাংশ সময়ই অর্ধেকের বেশি নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে। 

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রের তথ্যমতে, হাসপাতালে ১৫টি লিফটের মধ্যে দুটি প্যাসেঞ্জার ও ১৩টি বেড লিফট। একেকটি লিফট একেক সময়ে স্থাপন করা হলেও সর্বশেষ চার-পাঁচ বছর আগে দুটি লিফট লাগানো হয়। বর্তমানে গণপূর্তের খাতায় ১২টি সচল ও তিনটি অচল দেখানো হয়েছে। 

তবে গত সপ্তাহের মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার এবং চলতি সপ্তাহের শনি ও রোববার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচতলায় দেখা যায়, পাশাপাশি থাকা পাঁচটি লিফটের মধ্যে চারটিই বিকল। একমাত্র সচল লিফটের সামনে শতাধিক রোগী ও স্বজন অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের মধ্যে চার-পাঁচটি ট্রলিবাহী রোগী, অক্সিজেন লাগানো শিশু এবং একাধিক হুইলচেয়ারের রোগী ছিলেন।

হাসপাতালে আসা আশরাফুল ইসলাম নামে এক রোগীর স্বজন সমকালকে বলেন, চারটি লিফট ১০-১৫ দিন ধরে বন্ধ। ট্রলি ও হুইলচেয়ারে থাকা রোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে গিয়ে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক সময় ৬, ৭ বা ৮ তলায় রোগী মারা গেলে মরদেহ নামানোর জন্য লিফট পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে স্বজনকে সিঁড়ি দিয়েই মরদেহ নিচে নামাতে হয়।

কোটি টাকার বেতন আত্মসাৎ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তর ময়মনসিংহ কার্যালয়ের অধীনে মমেক হাসপাতাল, কেন্দ্রীয় কারাগার, আদালত ভবন, পুলিশ লাইন্স হাসপাতাল, সমাজসেবা অধিদপ্তর, কলকারখানা অধিদপ্তর, মিশন হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লিফট দেখভাল করা হয়। দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিবছর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ২০০৭ সাল থেকে মমেক হাসপাতালের লিফট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে আসছে নাঈমা এন্টারপ্রাইজ।

হাসপাতালের দুই ভবনের ১৫টি লিফট দুই থেকে তিন শিফটে চলার কথা। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি লিফটের জন্য শিফটভেদে দুই থেকে তিনজন অপারেটর থাকার কথা। গত বছরেও এসব লিফট দেখভালের জন্য ৩৫ থেকে ৪০ জন অপারেটরের বেতন নির্ধারণ করে দিয়েছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি অপারেটরের জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এই হিসাব অনুযায়ী, বেতন বাবদ প্রতি মাসে অন্তত ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং বছরে হাসপাতালের ২১টি লিফটের বিপরীতে প্রায় দেড় কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করে নাঈমা এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু চলতি বছরের আগস্ট মাসে হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন লিফটে একাধিকবার গিয়েও এক থেকে দুজনের বেশি অপারেটর দেখা যায়নি। নার্স, চিকিৎসক ও সাধারণ রোগীদের সঙ্গে কথা বলেও নিয়মিত অপারেটরের উপস্থিতি সম্পর্কে কোনো ইতিবাচক তথ্য মেলেনি।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, অপারেটরদের নামে কোটি টাকা তোলা হলেও মাত্র দু-তিনজন কর্মী দিয়ে ডিউটি করিয়ে পুরোটাই আত্মসাৎ করছে নাঈমা এন্টারপ্রাইজ। 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নাঈমা এন্টারপ্রাইজের এক লিফট অপারেটর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার থেকে আমাদের জনপ্রতি ২২ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হলেও কোম্পানি আমাদের দেয় মাত্র সাত হাজার টাকা। বাকি টাকা কোম্পানি মেরে খায়।’

গণপূর্তের যোগসাজশে যন্ত্রাংশ ক্রয়ের ফাঁদ
শুধু অপারেটরদের বেতন থেকেই নয়, লিফটের রক্ষণাবেক্ষণের (মেইনটেন্যান্স) জন্য বছরে বরাদ্দ থাকা ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকাও কোনো কাজ না করে ভুয়া ভাউচারে উত্তোলন করার অভিযোগ রয়েছে।

নগরীর ‘টপ লাইন এলেভেটর’ নামে একটি রক্ষণাবেক্ষণ কোম্পানির স্বত্বাধিকারী সাজ্জাদুল ইসলাম মুকুল অভিযোগ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় থেকে মেসার্স নাঈমা এন্টারপ্রাইজের মালিক ইব্রাহিম খান ময়মনসিংহের সাত-আটটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের লিফটের কাজ হাতিয়ে নেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের ম্যানেজ করে বছরের পর বছর তিনি একচেটিয়া কাজ করছেন। দরপত্র প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আবেদন করলেও সামান্য অজুহাতে তাদের বাদ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ৩১ আগস্ট নাঈমা এন্টারপ্রাইজের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, এক মাস আগে গোপনে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আবার তাদেরই আবার কাজ পাইয়ে দেন গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস। 

অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে ব্যবহৃত সিগমা, ওরনা, মোবি, মিৎসুবিশির মতো নামিদামি কোম্পানির লিফটের মাদারবোর্ড বা মোটরে সামান্য সমস্যা হলে দক্ষ প্রকৌশলী না থাকায় নাঈমা এন্টারপ্রাইজ তা মেরামত করতে পারে না। ফলে তারা অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সেগুলোকে ‘অচল’ ঘোষণা করে এবং চায়না থেকে কম দামি নিম্নমানের যন্ত্রাংশ কেনার পরামর্শ দেয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা ও নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাসকে ম্যানেজ করে নতুন করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা খরচ করে যন্ত্রাংশ কেনা হয়। এতে দীর্ঘদিন লিফট অচল থাকে, আর রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটিয়ে পুরোনো ভালো যন্ত্রাংশ সরিয়ে ফেলা হয়।

এমনকি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে। টপলাইন লিফটের প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম জানান, গত বছর গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি লিফট কেনার জন্য ৬২ লাখ টাকার দরপত্র জমা দিয়েছিল তাদের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু নাঈমা এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়ার সুবিধার্থে সেই দরপত্র বাতিল করে তৃতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরবর্তী সময়ে একই লিফট নাঈমা এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে ৮৪ লাখ টাকায় কেনা হয়।

বিকল এআরডি, প্রাণ হাতে নিয়ে লিফটে রোগী 
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী আধুনিক লিফটে ‘এআরডি’ (অটোমেটিক রেসকিউ ডিভাইস) থাকা বাধ্যতামূলক, যাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে লিফটটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাছের ফ্লোরে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। কিন্তু মমেক হাসপাতালের অধিকাংশ লিফটের এআরডি সিস্টেম ইচ্ছা করে অকেজো করে রাখা হয়েছে।
এর ফলে প্রায়ই লিফটে বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগী ও তাদের স্বজনরা ভেতরে আটকা পড়েন। গত বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নতুন ভবনের একটি লিফট প্রায় ২৫ জনকে নিয়ে টানা ৩০ মিনিট মাঝপথে আটকে ছিল। এতে রোগী ও শিশুরা শ্বাসকষ্টে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে।

লিফটে আটকে পড়া আসমা বেগম নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমার বাবা চারতলায় ভর্তি। গত এক সপ্তাহে আমি অন্তত তিনবার লিফটে আটকা পড়েছি। ভেতরে কোনো ফ্যান চলে না, আলো থাকে না। দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকার পর মনে হয় ভেতরেই মরে যাব।’

এ বিষয়ে হাসপাতালের ভেতরে দায়িত্বরত গণপূর্তের ইলেকট্রিশিয়ান দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘লিফট রক্ষণাবেক্ষণের পুরো দায়িত্ব ওই ঠিকাদারি কোম্পানির। গণপূর্তের বড় স্যারদের সঙ্গে কোম্পানির কী চুক্তি বা ডিল হয়, তা আমরা কর্মচারীরা কিছুই জানি না।’

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড়ে অবস্থিত নাঈমা এন্টারপ্রাইজের অফিসে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিক ইব্রাহিম খানকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তবে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মেহেদী হাসান পলাশ সমকালকে জানান, তাদের ময়মনসিংহ অফিসে অপারেটরসহ সাকল্যে ২০ জন কর্মী কাজ করেন। সরকারি বাজেট কমে যাওয়ায় অপারেটর সংখ্যা কমাতে হয়েছে। ইচ্ছাকৃত লিফট নষ্ট রাখা ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, কিছু যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে বিদেশ থেকে আমদানি করা ছাড়া উপায় থাকে না। যেমন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের লিফটের পার্টস বিদেশ থেকে অর্ডার করা হয়েছে।

সরকারি বরাদ্দের ২৫ হাজার টাকার বিপরীতে অপারেটরদের সাত হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা সরকারের কাছ থেকে লিফট দেখভালের চুক্তি পেয়েছি। আমরা কাকে কত টাকা দিয়ে কাজ করাব, সেটা আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়। এই বেতনে কাজ করতে না চাইলে না করবে। গত সপ্তাহেও এই কারণে দুজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন সমকালকে বলেন, ‘নাইমা এন্টারপ্রাইজের মালিক ইব্রাহিম খান সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের ক্যাশিয়ার ছিলেন। পুরো জেলায় লিফটের কাজ এখনও সব তারা করে। আর গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস ও নাইমা এন্টারপ্রাইজ মিলে একটি চক্র হিসেবে কাজ করে। আমি দ্রুত সময়ের ভেতর জনস্বার্থে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাই।’

এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাসের কার্যালয়ে গেলে তিনি দেখা করতে রাজি হননি। পরে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমকালকে বলেন, ‘হাসপাতালের লিফটের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি আমার জানা ছিল না। কিছুদিন আগেই ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টের প্রকৌশলীরা বদলি হয়েছেন। নতুন প্রকৌশলীরা দুই-এক দিনের মধ্যে যোগ দেবেন। আমি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছি। আমার প্রকৌশলীদের নিয়ে চলতি সপ্তাহেই হাসপাতাল পরিদর্শন করে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’

হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলাম জানান, ‘লিফটের সমস্যার কারণে হাজার হাজার রোগী ভোগান্তির শিকার হয় প্রতিদিন। আমাদের ডাক্তার নার্সরা লিফট না পেয়ে রোগী বাঁচাতে সাত-আটতলায় হেঁটে ওঠেন। আমরা বারবার তাগিদ দিলেও তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।’ 

আরও পড়ুন

×