ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি খাতে নতুন প্রস্তাব বিরোধপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সকারের

জ্বালানি খাতে নতুন প্রস্তাব বিরোধপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সকারের
×

 হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৬ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সকার আবারও বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ, নতুন ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল নির্মাণ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সঙ্গে চলমান আইনি বিরোধের মধ্যেই কোম্পানিটি এমন প্রস্তাব দিল। পুরোনো বিরোধ নিষ্পত্তির আগেই নতুন উদ্যোগ কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে জ্বালানি বিভাগ প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে পর্যালোচনা করছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত জুনে সকার সরকারকে কয়েকটি পৃথক প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি ভিত্তিতে) দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ। প্রস্তাব পাওয়ার পর বিষয়গুলো পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে জুনের প্রথম সপ্তাহে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আজারবাইজান সফর করেন। ৩ জুন সেখানে সকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ছয় সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মন্ত্রী। বৈঠকের প্রায় দুই সপ্তাহ পর ১৫ জুন জ্বালানি বিভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পাঠায় সকার।

প্রস্তাব পাওয়ার দুদিনের মাথায় ১৭ জুন তা আলোচনার জন্য জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন)-এর কাছে পাঠানো হয়। গত ১ জুলাই জ্বালানি বিভাগের উপসচিব মোছা. মাসুদা বেগম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পেট্রোবাংলাকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহের বিষয়ে সকার ও আরপিজিসিএলের মধ্যে সম্ভাব্য সেলস অ্যান্ড পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (এসপিএ) স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। একই সঙ্গে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাবও পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়।

মন্ত্রীর আজারবাইজান সফরের মাত্র এক মাসের মাথায় প্রস্তাব পর্যালোচনায় জ্বালানি বিভাগের তড়িঘড়ি লক্ষ্য করা গেছে।  জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন সমকালকে বলেন, এলএনজি সরবরাহ ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে সক্ষম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। তাই নতুন কোনো চুক্তিতে যাওয়ার আগে চলমান বিরোধ, আইনি ঝুঁকি এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

এলএনজি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি
চিঠিতে সকার জানিয়েছে, তারা দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) বাংলাদেশকে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ করতে চায়। ৫ থেকে ১৫ বছর মেয়াদে বছরে পাঁচ লাখ থেকে ১৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কোম্পানিটি বলছে, বিভিন্ন উৎস থেকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে এলএনজি সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। 
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সকার নিজে এলএনজি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নয়। তারা বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি কিনে অন্য দেশে সরবরাহ করে। বর্তমানে বাংলাদেশ কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি কিনছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রয়োজনীয়তা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুযায়ী বিদেশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জিটুজি ভিত্তিতে দরপত্র ছাড়া চুক্তির সুযোগ রয়েছে।

নতুন এফএসআরইউ
সকারের প্রধান উন্নয়ন কর্মকর্তা তোগরুল কোচারলির স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার চাইলে জিটুজি ভিত্তিতে নতুন এফএসআরইউ স্থাপন এবং সেখান থেকে এলএনজি সরবরাহে তারা আগ্রহী।

এর আগে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্টও বাংলাদেশে তৃতীয় এফএসআরইউ নির্মাণ নিয়ে একটি প্রাথমিক প্রস্তাব দিয়েছিল সকার। সর্বশেষ চিঠিতে সেই প্রস্তাব পুনরায় বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে। 
সংশ্লিষ্টদের মতে, দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সক্ষম একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে প্রায় ৬০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় সাত হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। প্রকল্পের ধরন ও অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে এ ব্যয় আরও বাড়তে পারে। চিঠিতে খুলনার রূপসা কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট পরিচালনায় সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। 

বাপেক্সের সঙ্গে বিরোধের সূত্রপাত
২০১৭ সালে তিনটি গ্যাস কূপ খননের জন্য বাপেক্স ও সকারের মধ্যে ৩৯৯ কোটি টাকার চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী দক্ষিণ সেমুতাং-১ কূপ খনন করে সকার। তবে সেখানে গ্যাসের সন্ধান মেলেনি। ওই কূপ খননের জন্য সকারকে ১৪২ কোটি টাকা পরিশোধ করে বাপেক্স। এরপর বেগমগঞ্জ-৪ কূপ খননের প্রস্তুতি ব্যয়, খননস্থান নির্ধারণ এবং বিল পরিশোধ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। বাপেক্সের কর্মকর্তাদের মতে, চুক্তির বাইরে গিয়ে প্রস্তুতি বাবদ সকার প্রায় ৭৩ কোটি টাকা অগ্রিম দাবি করে, যা বাপেক্স দিতে রাজি হয়নি। এরপর কাজ শেষ হওয়ার ২৮ কার্যদিবসের মধ্যে বিল পরিশোধ করা হয়নি– এমন অভিযোগ তুলে ২০১৯ সালের জুনে সকার চুক্তি বাতিল করে।

পরবর্তী সময়ে বিরোধ আন্তর্জাতিক আদালতে গড়ায়। পারফরম্যান্স গ্যারান্টি, রিগ আটকে রাখা, ডিমোবিলাইজেশন, সাব-কন্ট্রাক্টরের পাওনাসহ ১১টি খাতে বাপেক্সের কাছে প্রায় ৮৮৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে তারা। সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালত বাপেক্সকে প্রায় ৫২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। তবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের আদালতে আপিল করে বাপেক্স। ফলে মামলাটি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।

জানতে চাইলে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক সমকালকে বলেন, সফরে কী আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে অবগত নই। তবে চলমান মামলার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বাপেক্স ও সকারের বিরোধ আদালতের বাইরেও আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব। তবে নতুন সহযোগিতার আগে বিদ্যমান বিরোধের গ্রহণযোগ্য সমাধান হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

 

আরও পড়ুন

×