জুলাইয়ের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হট্টগোল, রাষ্ট্রপতি মর্মাহত
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাইযোদ্ধাদের সম্মাননা স্মারক তুলে দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। গতকাল বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে- পিআইডি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৩ | আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্র নিয়ে বিতর্ক ও হট্টগোল হয়েছে। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ ঘটনায় তিনি মর্মাহত হয়েছেন।
গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাইযোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। তথ্যচিত্রটি শেষ হওয়ার পরপরই দর্শক সারিতে থাকা জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের একাংশ ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন।
তাদের অভিযোগ, তথ্যচিত্রে আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাদ পড়েছে। এতে নানা অসংগতি রয়েছে। বিশেষ করে ৩ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ সেখানে অনুপস্থিত ছিল। তথ্যচিত্রে শহীদ আবু সাঈদের অনুপস্থিতি, এক দফা ঘোষণা ও ৯ দফা নিয়ে তথ্যের অসংগতির অভিযোগ এনে তারা প্রতিবাদ করেন।
বিক্ষুব্ধদের অভিযোগ, অনুষ্ঠানে প্রচারিত তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারিতে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। এটা নিয়ে শুরুতে বাগ্বিতণ্ডা আর স্লোগান দিতে থাকেন তারা। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের বক্তব্যে তাঁর আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি ধমকের সুরে সবাইকে থামতে বলেন এবং কৃতিত্ব নিয়ে অভিযোগ তোলেন। এতে হট্টগোল বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। হট্টগোলের এক পর্যায়ে কূটনীতিকরা বের হয়ে যান।
‘আমি মর্মাহত’, বললেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি
অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ভুলত্রুটি মানুষের হতেই পারে। সবাই মিলে সেসব ভুল সংশোধন করতে হবে। তবে জাতীয় অনুষ্ঠানে বিদেশিদের সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এইভাবে যে বিদেশের সামনে, বিদেশি অতিথিদের সামনে যে নাস্তানাবুদ হলাম, এটি আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে। এই ঘটনায় সবচেয়ে খুশি হবে যিনি পাশের দেশে বসে আছেন, তাঁর জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন।’
অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে ভুলের সমালোচনা করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, সেখানে শহীদ আবু সাঈদের ছবি ছিল না। অথচ আবু সাঈদ জুলাই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি ও প্রতীক। তাঁর ছবি ছাড়া ওই আন্দোলনের কোনো তথ্যচিত্র পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবিও তথ্যচিত্রে ছিল না বলে উল্লেখ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ নিজের বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘দলীয়করণ করা যাবে না’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি বলি জুলাই কার? জুলাই কার? তাহলে জুলাই আমাদের কারোই থাকবে না।’
যে কারণে হট্টগোল
এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার অনুষ্ঠানে ছিলেন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন, তথ্যচিত্রে এক দফার ঘোষক বানানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। যে নাহিদ ইসলাম (এনসিপির আহ্বায়ক) নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে এক দফার ঘোষণা দিলেন, তিনি বিএনপির ইতিহাসে নেই। যে আসিফ মাহমুদ (এনসিপির মুখপাত্র) মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করলেন, তিনি ইতিহাসে নেই। মাহিন সরকার আরও লিখেছেন, অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রের প্রতিবাদ করার কারণে প্রধানমন্ত্রীর বাহিনী তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রপতির সামনে তাঁর ওপর হামলা করা হয়েছে।
হট্টগোল চলাকালে মঞ্চ থেকে অনুষ্ঠানের উপস্থাপক সবাইকে শান্ত হওয়ার জন্য বারবার আহ্বান জানান। কিন্তু হট্টগোল থামেনি। এক পর্যায়ে অনুষ্ঠানের মঞ্চে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে শান্ত হওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’ একই সঙ্গে তথ্যচিত্রে কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধনের কথাও বলেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়
অনুষ্ঠানে শৃঙ্খলা না আসায় মাইকের সামনে আসেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য আসছেন?’যারা স্লোগান দিচ্ছিলেন, তাদের উদ্দেশে ইশরাক হোসেন আরও বলেন, ‘কী করছেন আপনারা? আপনারা শহীদ পরিবারদের জন্য কী করেছেন? কিছুই করেন নাই আপনারা।’ তাঁর এই মন্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এসে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও মাইকের সামনে আসেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের মধ্য থেকে যারা বক্তব্য দিতে চান, দয়া করে এখানে এসে কথা বলুন। ... আপনাদের বক্তব্য ... আপনারা বলুন; আমরা শুনব। কিন্তু শান্তশিষ্টভাবে বসুন দয়া করে।’
এনসিপি নেতাদের অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে কয়েকবার ডাকেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিছুক্ষণ পরে মঞ্চে ওঠেন আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি জুলাইযোদ্ধাদের একজন হয়ে এবং আমার দলের একজন প্রতিনিধি হিসেবে এই প্রোগ্রামের সফলতা কামনা করি; কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পক্ষে এবং আমার যে সহযোদ্ধারা আছেন, তাদের জন্য একটি সুন্দরের আকাঙ্ক্ষায় আমার পক্ষে এই প্রোগ্রামে অবস্থান করা সম্ভব নয়।’
মঞ্চ ছাড়ার আগে এনসিপির সদস্য সচিব বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় একটা প্রোগ্রামেও আমরা ইতিহাসের সবকিছু ধারণ করতে ব্যর্থ হলাম। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, এই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেমন একপেশেভাবে আওয়ামী লীগ দখল করেছিল; ঠিক একই ধরনের একটা পরিস্থিতি এখানে তৈরি হয়েছে।’
জুলাই আন্দোলনের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্রের প্রতিবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বেরিয়ে যান আখতারসহ এনসিপির নেতারা।
- বিষয় :
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস