তারেক রহমানকেও ‘আয়নাঘরে’ নির্যাতন করা হয়েছিল: চিফ প্রসিকিউটর
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৩৯ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৫৮
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও জেআইসির একটি কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষীদের বর্ণনা ও আমাদের তদন্তে এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে।
আজ শনিবার ঢাকা সেনানিবাসের কচুক্ষেত এলাকায় ডিজিএফআই সদর দপ্তরে থাকা জেআইসির গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। এদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী, প্রসিকিউশন, আসামিপক্ষের আইনজীবী, গণমাধ্যমসহ একটি প্রতিনিধিদল জেআইসি পরিদর্শন করেন।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ শাসনামলে অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে অমানবিকভাবে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) বন্দি করে রাখা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই সেলগুলোর অনেক তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করা হয়েছে এবং ওয়াল দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে।’
এর আগে গত ১ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় র্যাব-১ সদর দপ্তরে থাকা টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল বা আয়নাঘর পরিদর্শন করেন তারা। ওই দিন ছোট-বড় মোট ২৯টি কক্ষ ঘুরে দেখেন বিচারপতি মর্তূজাসহ ট্রাইব্যুনালের একাধিক বিচারপতি ও প্রসিকিউটররা। একইসঙ্গে সাতটি ডেথ সেলে বন্দিদের আটকে রেখে নির্যাতনের চিত্র সম্পর্কে ধারণা নেন তারা।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বিচারের একটি অংশ হিসেবে টর্চার সেল বা ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিত জেআইসিতে আমাদের এই পরিদর্শন। ২৬টি এই গোপন বন্দিশালায় অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে বন্দি রেখে অত্যাচার ও অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। সেই নির্মম চিত্র আমাদের এই পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে কিছুটা অনুভব করা গেছে।
তিনি বলেন, এটি মূলত মানুষকে ধরে এনে অত্যাচার ও নির্যাতন চালানোর একটি সেল ছিল। এই বন্দিশালার কক্ষগুলো ছিল সাউন্ডপ্রুফ এবং জানালা-দরজাবিহীন অন্ধকার প্রকোষ্ঠ। সেখানে ভারী এক্সজস্ট ফ্যান লাগানো ছিল, যাতে বন্দিদের কান্নার শব্দ বাইরে যেতে না পারে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, গোপন এই বন্দিশালায় অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, হুম্মাম কাদের চৌধুরীসহ বহু মানুষকে বছরের পর বছর নির্জন কক্ষে অমানবিকভাবে বন্দি রেখে নির্যাতন করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, তাকেও কিন্তু এই জেআইসি সেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তিনি কতদিন বন্দি ছিলেন, তার নিজের হাতের একটা লেখা ছিল ‘এইচ কিউ সি’। সেটি পরে সাদা রং করে প্লাস্টার করে দিয়েছে। প্লাস্টারের পরেও তার এই লেখাটা কিন্তু এখনো জেআইসি সেলের একটি রুমে আছে। আমরা এগুলো সিলগালা করে রেখেছি। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এগুলো আমাদের কাস্টডিতে থাকবে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই জেআইসিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ইসলামিক সংগঠনের নেতা, ভিন্ন মতের ব্যক্তিদের ধরে আনা হয়েছিল। অনেক মানুষকে এখান থেকে পরে গুম করা হয়েছে। অনেক ভিকটিমদের এখন পর্যন্ত কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এর জবাব তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের দিতে হবে। তবে ভবিষ্যতে যেন এমন কোনো টিএফআই বা জেআইসি তথা আয়নাঘর প্রতিষ্ঠিত না হয়, সে জন্য আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাব।
তিনি বলেন, কোনো নাগরিক অপরাধ করলে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কিন্তু বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যার শিকার যেন কেউ না হন, এভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে অহেতুক হয়রানির শিকার যেন না হন, সেটিই আমরা চাইব।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ শাসনামলে গত ১৬ বছর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি অমানবিক রাষ্ট্র কায়েম হয়েছিল। অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এই আয়নাঘর নামীয় টর্চার সেল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অতিউৎসাহী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য। তারা সরকার বিরোধী মতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা বা ভিন্ন মতপথের মানুষকে গুম করে এসব বন্দিশালায় রাখতেন। গুমের এমন অনেক ভুক্তভোগীর আমরা এখন পর্যন্ত কোনো হদিস পাইনি।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে টিএফআই ও জেআইসিতে সংঘটিত গুম-নির্যাতনের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারকাজ চলছে। এইসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেক কর্মকর্তাকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে এখানে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এই পরিদর্শন নিয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিমূলক কথা বলছেন। শেখ হাসিনা তার যখন যেমন মন চায়, সেভাবে কথা বলেন, তাদেরই প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের ডিফেন্সের বন্ধুরাও একই ভাষায়, একইরকম করে বিভ্রান্তিমূলক কথা বলেন।’
তিনি জানান, যেকোনো বিচারকের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের আইনগত বৈধতা রয়েছে। ট্রাইব্যুনালে যে বিচার হচ্ছে সেটা স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানের। এই পরিদর্শন ন্যায়বিচারের জন্য গুরুত্ব বহন করবে।
- বিষয় :
- চিফ প্রসিকিউটর
- প্রধানমন্ত্রী
- আয়নাঘর
- তারেক রহমান