প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ
সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে জোর দিল্লিকে
সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০০:১৩ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০০:১৫
দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে ভারতকে তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ। শরিফ ওসমান হাদির খুনি এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে ঢাকা। এসব বিষয়ে অগ্রগতির আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিশ্চিত নয় বলেও বার্তা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সচিবালয়ে তাঁর কার্যালয়ে প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও প্রতিবেশী দূতকে বাংলাদেশের মনোভাব জানানো হয়। আপত্তি জানানোর পরও ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ দেওয়ায় চিঠির পর সাক্ষাতেও ক্ষোভ জানিয়েছে ঢাকা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া ভারত আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগের পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অবনতি হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতারা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে তিক্ততা আরও বাড়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার, বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনে হামলা, দেশটির রাজনীতিকদের বাংলাদেশ বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য, সীমান্তে হত্যার মতো ঘটনায় মাঝেমধ্যেই উত্তেজনা বেড়ে যায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভিসা বন্ধ, সড়ক-রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। গত ডিসেম্বরে হত্যার শিকার হাদির খুনিরা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সম্পর্কের আরও অবনতি হয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির সরকার গঠনের পর ধারণা করা হচ্ছিল সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়া এবং সীমান্তে ভারতের পুশইন প্রচেষ্টায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি পাঠানো, তাঁকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানানো, ভিসা সেবা চালুর মতো পদক্ষেপে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে কিছু এগোলেও, দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে আবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ ভারতকে
এই পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল সোমবার ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ এলে বাংলাদেশ বার্তা দেয়, অস্বস্তি তৈরির কারণগুলো বন্ধ করতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে সহায়ক পরিবেশ দরকার, সেই ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে অবস্থান করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ত্বরান্বিত করতে দিল্লিকে অনুরোধ করেছে ঢাকা। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের প্রত্যর্পণেরও অনুরোধ করা হয়েছে।
হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের ভারতে ধরা পড়ার কথা উল্লেখ করে খলিলুর রহমান বলেন, ‘ভারত যেসব কাগজপত্র চেয়েছিল সবকিছু তাদের দিয়েছি। আমাদের জন্য এটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। আমরা বলেছি, হত্যাকারীদের যত দ্রুত সম্ভব আমাদের কাছে প্রত্যর্পণ করার জন্য।’
সাক্ষাতে সীমান্ত হত্যা ও পুশইন নিয়ে আলোচনা প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এগুলো নিয়ে খুব সংক্ষেপে আলোচনা হয়েছে। এগুলো তো প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনার বিষয় নয়।
৫ আগস্টের ঘটনা নিয়ে ভারতকে চিঠি পাঠিয়ে অসন্তোষ জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দিল্লির দূতের সাক্ষাতে তা এসেছে কিনা, প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘৫ আগস্টের ব্যাপারে আমাদের যে অবস্থান, স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছি। যা গুরুত্বের সঙ্গে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে। ভারত তা গত রোববার জানিয়েছে। আজকেও (সোমবার) তারা প্রধানমন্ত্রীকেও বলেছে।’
ভারত দুঃখ প্রকাশ করেছে কিনা–এমন প্রশ্নে খলিলুর রহমান বলেন, এখানে দুঃখ প্রকাশের ব্যাপার নেই। রাষ্ট্রের তিনটা স্তম্ভ থাকে–নির্বাহী, আইন প্রণয়ন এবং বিচার বিভাগ। হাসিনা বিচার বিভাগ থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত। তিনি ৫ আগস্ট বাংলাদেশের বিচার বিভাগ তথা রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন। কাজটি ভারত সরকার করতে দিয়েছে।
বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গতকালও (রোববার) বলেছি, রাষ্ট্রের কাঠামোর প্রতি সব দেশ শ্রদ্ধাশীল হোক। আশা করব, বিষয়টি ভারত সরকার অনুধাবন করতে পারবে। ধারণা হচ্ছে, তারা এই বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। আশা করব, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে আন্ডারমাইন (খাটো) করার কিছু তারা আর করবে না। তাদের সঙ্গে আমার যা কথা হয়েছে আমি কিছুটা হলেও আশ্বস্ত, এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।’
প্রধানমন্ত্রী সফর নিশ্চিত নয়
নয়াদিল্লি থেকে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া দুই দফা আমন্ত্রণ বাংলাদেশ কী গ্রহণ করবে–এই প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথমত আমি গণক নই। পরের জিনিসটা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিমসটেকের চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে। এই পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা করবেন। এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠিটা সরকার গঠনের দিন হস্তান্তর করা হয়েছিল। সেখানে তিনি (ভারতের প্রধানমন্ত্রী) আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমন্ত্রণ একটা আছে।’
ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাতের সময় প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা–এমন প্রশ্নে খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা এখনও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’
আলোচনাকে সমাধান বললেন ভারতীয় দূত
ভারত সে দেশের সাবেক মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে হাইকমিশনার করে ঢাকায় পাঠিয়েছে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে। দীনেশ ত্রিবেদীর আগে ভারত কোনো রাজনীতিককে ঢাকায় হাইকমিশনার করে পাঠায়নি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার যেকোনো সমস্যা সমাধানে সংলাপ এবং গঠনমূলক আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেন, ‘আমার পূর্ণ আস্থা আছে, দুই দেশ একসঙ্গে বসলে এমন কোনো সমস্যা নেই যা সমাধান করা যায় না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাধান খুঁজে বের করা, যা ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের জন্য লাভজনক হয়।’
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে হাইকমিশনার বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একজন বিনয়ী নেতা। তিনি জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত থাকেন। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে শুধু একটি অভিন্ন সীমান্তই নয়, আরও অনেক কিছু রয়েছে। আমরা শুধু সীমান্তই ভাগ করি না, আমরা স্বপ্নও ভাগ করি।’
হাইকমিশনার বলেন, দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে মতপার্থক্য ও সমস্যা থাকাটা স্বাভাবিক। এই ধরনের মতপার্থক্যকে কূটনীতি বা সম্পর্কের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং খোলামেলা ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান করা যেতে পারে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে হাইকমিশনার বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ‘ভালোবাসা, সম্মান ও স্নেহের’ জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অব্যাহত সংলাপ, সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে দুই দেশ তাদের অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে তাঁর বিশ্বাস।