রেমিট্যান্সের আড়ালে যেন হারিয়ে না যায় মানুষের জীবন
ছবি-সংগৃহীত
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ২৩:০০
রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুন লেগেছিল ৯ আগস্ট। সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়, সেই আগুন কেড়ে নিয়েছে ১৬ জন বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের প্রাণ। কারখানায় মোট ১৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করতেন। এর মধ্যে হাবিবুর রহমান নামের একজন শ্রমিক ঘটনার সময় কারখানার বাইরে থাকায় দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছেন।
এমন মর্মান্তিক ঘটনার পর আমাদের স্বাভাবিক মনোযোগ রয়েছে নিহতদের পরিচয়, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণের দিকে। এসব অবশ্যই জরুরি। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন করা দরকার– বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তার দায় কার?
প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অভিবাসী শ্রমিককে আমরা প্রায়ই অর্থনীতির একটি সংখ্যা হিসেবে দেখি। তারা বিদেশে যান, কঠোর পরিশ্রম করেন এবং দেশে রেমিট্যান্স পাঠান। সেই অর্থ আমাদের অর্থনীতিকে সচল রাখে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অবদান রাখে, অসংখ্য পরিবারের জীবনযাত্রা বদলে দেয়। কিন্তু যে মানুষটি এই অর্থ পাঠান, তাঁর নিজের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা যেন সেই হিসাবের আড়ালে হারিয়ে না যায়।
রিয়াদের এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জানতে হবে কারখানাটিতে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা কেমন ছিল? পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমনপথ ছিল কিনা? অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কিনা? কারখানায় দাহ্য পদার্থের ব্যবহার এবং বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল কিনা?
অভিবাসী শ্রমিক যে দেশে কাজ করেন, সেই গন্তব্য দেশের দায়িত্ব এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি। রিয়াদে যা ঘটেছে সেখানে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব বর্তায় সৌদি রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তার। তবে এর অর্থ এই নয় যে, শ্রমিক পাঠানো দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কোনো দায় নেই। বরং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুরু হওয়া উচিত একজন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার আগেই।
একজন শ্রমিক কোথায় যাচ্ছেন, কী কাজ করবেন, তাঁর নিয়োগকর্তা কে, কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি কী, বেতন ও কর্মঘণ্টা কত, থাকার ব্যবস্থা কেমন– এসব তথ্য তাঁকে স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন। তিনি যে নিয়োগ চুক্তিতে সম্মতি দিচ্ছেন, সেটি তিনি বুঝতে পারছেন কিনা, নিয়োগের নামে তাঁর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে কিনা, বিদেশে গিয়ে চুক্তির শর্ত পরিবর্তন হওয়ার আশঙ্কা আছে কিনা– এসবও নিরাপদ অভিবাসনের অংশ।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যকে শ্রমিকের মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা একজন শ্রমিকের মৌলিক অধিকার। অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে অজ্ঞতা, নিয়োগকর্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং অনিরাপদ আবাসন ও কর্মপরিবেশ তাদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যুতে তাদের পরিবার শুধু প্রিয় একজন মানুষকে হারায়নি; অনেক পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রধান বা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। ফলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা বা এককালীন কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে সৌদি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তার সঙ্গে কার্যকরভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঘাটতি, অবহেলা বা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আইনানুগ ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সহায়তার ব্যবস্থাও করতে হবে। নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক অনুদান নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা, সন্তানদের শিক্ষা, পরিবারের পুনর্বাসন এবং জীবিকার সুযোগ তৈরির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কারণ ক্ষতিপূরণ কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়। কর্মক্ষেত্রে অবহেলা বা নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে একজন শ্রমিকের মৃত্যু হলে তার পরিবারের ন্যায্য প্রতিকার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
অভিবাসী শ্রমিকের অধিকারকে শুধু মজুরি পাওয়ার অধিকার হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক সুরক্ষা, মর্যাদাপূর্ণ আচরণ, অভিযোগ করার সুযোগ এবং অধিকার লঙ্ঘিত হলে কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার অধিকার– সবই তাঁর শ্রমিক অধিকার ও মানবাধিকারের অংশ।
রিয়াদে ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু তাই আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থার দিকে নতুন করে তাকানোর দাবি তৈরি করেছে। শুধু সৌদি আরবের ওই কারখানায় কী ঘটেছিল, তা জানলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাওয়া শ্রমিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং অধিকার সুরক্ষার সামগ্রিক কাঠামো কতটা কার্যকর– সেই প্রশ্নও সামনে আনতে হবে।
একজন শ্রমিক বিদেশে যান শুধু নিজের জন্য নয়। তাঁর আয়ের সঙ্গে একটি পরিবার, কখনও একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। তাঁর পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে। কিন্তু তাঁর জীবনকে কোনোভাবেই সেই অর্থের পরিমাণ দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না।
আমরা প্রায়ই অভিবাসী শ্রমিকদের ‘রেমিট্যান্সযোদ্ধা’ বলে অভিহিত করি। এই অভিধা তাদের অবদানের স্বীকৃতি হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষকে শুধু তাঁর অর্থনৈতিক অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা যায় না। তিনি তার চেয়েও বেশি– তিনি একজন নাগরিক, একজন শ্রমিক এবং সর্বোপরি একজন অধিকারসম্পন্ন মানুষ।
রিয়াদের আগুনে ১৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু তাই কেবল একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা হিসেবে আমাদের স্মৃতিতে থেকে গেলে চলবে না। তাদের মৃত্যু থেকে আমাদের একটি শিক্ষা নিতে হবে– অভিবাসী শ্রমিকের নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি তাঁর অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তা, অভিবাসী শ্রমিক গ্রহণকারী ও প্রেরণকারী রাষ্ট্রের।
বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাই প্রত্যাশা থাকবে, নিহত ১৬ শ্রমিকের পরিবারকে যথাযথ আর্থিক সহায়তা ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে এই অগ্নিকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- সৌদি আরব