ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

জনস্বাস্থ্য

ওষুধ নীতিমালা নিয়ে পশ্চাৎমুখী সিদ্ধান্ত

ওষুধ নীতিমালা নিয়ে পশ্চাৎমুখী সিদ্ধান্ত
×

মুশতাক হোসেন

মুশতাক হোসেন

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১১:১১

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নীতিমালা বাতিল করেছে সরকার। সরকারের এ পদক্ষেপের কারণে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি তিন দশক আগের নিয়মে ফিরেছে। পুরোনো নিয়মে ফেরার কারণে সরকারি নজরদারি দুর্বল হলে ভোক্তাদের ব্যয় বাড়বে। বিষয়টি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম কমানো এবং বিনামূল্যে প্রাথমিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলেছিল বিএনপি। অথচ এমন পদক্ষেপ তার উল্টো। এতে ওষুধের ব্যয় বাড়বে। মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই যেখানে ওষুধে যায়, সেখানে সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে নাগরিকের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবি আমরা অনেক দিন ধরেই জানিয়ে আসছিলাম। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্নজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে যে উদ্যোগ নিয়েছিল, সেটাও বলা যায় অসম্পূর্ণ। এর পরও সেটা একটা জরুরি ও ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু এ সরকার তাও বাতিল করে দিল! 

যুক্তি দেখানো হচ্ছে, জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ বা আলোচনা না করেই ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল। এই আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘিত হওয়ায় মন্ত্রিসভা সেই তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ নীতি বাতিল করেছে এবং ১৯৯৪ সালের আগের নিয়ম বহাল রেখেছে। প্রশ্ন হলো, এখন এই সরকার যে সেই নীতি বাতিল করল, তারা কি উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করেছে? বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের যেই ভুলের কথা বলেছে, সেই ভুল তো এখন নিজেরাই করেছে। 

১৯৯৪ সালের নীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ওষুধের সংখ্যা ছিল ১১৭, যা ২০১৬ সালের নীতিতে বাড়িয়ে করা হয়েছিল ২৮৫টি। সবশেষ ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয় ২৯৫। এখন ২০১৬ এবং ২০২৫ সালের তালিকা বাতিল করে ১৯৯৪ সালের নীতিতে ফেরায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তা সাধারণ মানুষের জন্য আরও কষ্টদায়ক হবে।

আমরা জানি, ১৯৮২ সালের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের ১১ ধারা অনুযায়ী ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে ছিল। সেই ভিত্তিতে ১৯৯৩ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৭৩৯টি ওষুধের দাম নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু ১৯৯৪ সালের একটি সার্কুলারের মাধ্যমে সেই ক্ষমতা সীমিত করে মাত্র ১৭৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের হাতে রাখা হয়। বাকি সব ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে। এই সার্কুলার চ্যালেঞ্জ করে ২০১৮ সালে জনস্বার্থে রিট করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)। গত বছরের আগস্টে সেই মামলার রায়ে আদালত বলেছিলেন, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম সরকারকেই নির্ধারণ এবং তা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হবে। অথচ বর্তমান সরকার আদালতের সেই নির্দেশনাও উপেক্ষা করেছে। এটা ঠিক হয় না। আমরা জানি না, কাদের পরামর্শে সরকার এমন জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার যেই অঙ্গীকার করেছিল এবং চিকিৎসা খরচ কমে যাওয়ার যেই দাবি করেছিল, এই অঙ্গীকারের বিপরীত কাজই সরকার করেছে।

বর্তমানে অনেক ধরনের অসুখ ব্যাপক হারে বেড়েছে। ডায়াবেটিস বেড়েছে বা অন্যান্য যে অসংক্রামক ব্যাধি ও ক্যান্সার এখন দেখা যাচ্ছে, সেগুলো আগে অতটা ছিল না। ফলে তিন দশকের আগের তালিকায় এসব ওষুধ নেই। যাদের একবার ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা কিডনির সমস্যা হয়, তাদের কিন্তু সারাজীবনই ওষুধটা চালিয়ে যেতে হয়। কাজেই তাদের জন্য খরচ অনেক বেড়ে যাবে।

রোববার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন বলছে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের নতুন তালিকা এবং মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল ঔষধ শিল্প সমিতি। গত ৩০ জুন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে নীতিটি পর্যালোচনার জন্য জরুরি বৈঠকের অনুরোধ করা হয়। সুতরাং ওষুধ কোম্পানির আপত্তি কতটা কাজে লেগেছে– যেখানে সরকারের দায়িত্ব হলো, সাধারণ মানুষের স্বার্থ দেখা। রোগীর পকেট থেকে চিকিৎসা খাতে যে খরচ হয়, তা কমিয়ে আনা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের করা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নীতিমালা বাতিল করার মাধ্যমে সরকার তার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। যেখানে সরকারের উচিত ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার ওষুধের মূল্য নির্ধারণে যে কাজ করে গেছে, তাকে শক্তিশালী করা সেখানে বিপরীতমুখী পদক্ষেপ আমরা দেখলাম। 

সরকারের উচিত হবে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা। সাধারণের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিমালা অক্ষুণ্ন রাখা। সরকার বলছে, ওষুধের মূল্য নির্ধারণে নতুন একটি কমিটি করা হবে। ওই কমিটি প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের দাম বাড়ানো বা কমানোর প্রস্তাব দিতে পারবে। আমি মনে করি, ২০২৬ সালের নীতিমালা বহাল রেখেই কমিটি কাজ করতে পারে। ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের চিন্তা সর্বাগ্রে জরুরি। নির্বাচনী ইশতেহারে অঙ্গীকার করার পর সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত অন্যায্য ও অবৈজ্ঞানিক।

চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই ব্যক্তিকে বহন করতে হয়। আর ওষুধ যেহেতু চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ, তাই প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা ও দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি নীতি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সরকারের ভূমিকা না থাকলে সাধারণ মানুষ বিপদে পড়বে। মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ানোর পরিবর্তে কীভাবে তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে পারে, সে ধরনের পদক্ষেপ জরুরি। ১৯৯৪ সালের পুরোনো তালিকায় ফেরত যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়, কারণ তখন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ছিল ১১৭টি। আর অন্তর্বর্তী সরকার তার সঙ্গে ১৮০টি ওষুধ যুক্ত করে ২৯৭টির গেজেট প্রকাশ করে। বাস্তবে ওষুধের তালিকা আরও বড় হতে পারে। এখানে অন্যান্য ফাঁকফোকরও বন্ধ করা দরকার। যেমন অনেক কোম্পানি তালিকায় থাকা ওষুধ ভিন্ন নামে বাজারজাত করছে, যাতে নিজেদের মতো দাম নির্ধারণ করতে পারে। সংগত কারণেই ওষুধের দামে স্বস্তি দিতে সরকারের করণীয় অনেক বেশি। কিন্তু পেছনে ফিরে গেলে এগুলোও উপেক্ষিত থেকে যাবে।

ডা. মুশতাক হোসেন: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×