অর্থনীতি
একটি মোনাজাতের খসড়া...
সাহিদ রেজা
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০৫
আশির দশকের শেষ দিকে কবি শামসুর রাহমান তাঁর বিখ্যাত ব্যঙ্গধর্মী কবিতা ‘একটি মোনাজাতের খসড়া’ লিখেছিলেন। কবিতাটি ছিল এমন এক সময়ের প্রতীক, যখন অন্যায়, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারে মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্ষয় হতে শুরু করেছিল। ন্যায়বিচার ও সুবিচারের প্রত্যাশায় কবি তখন যেন শেষ আশ্রয় হিসেবে সৃষ্টিকর্তার কাছেই ফিরে গিয়েছিল। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কবিতাটি তাই শুধু সাহিত্য নয়; নাগরিক বিবেকেরও প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
আজ, স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েও সেই কবিতার কথা মনে পড়ে। কারণ অর্থনীতির ভাষা যেমন প্রবৃদ্ধির কথা বলে, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবতাও তুলে ধরে। বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, আয়ের বৈষম্য, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা; এসব মিলিয়ে উন্নয়নের সরকারি পরিসংখ্যান ও মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি দৃশ্যমান ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশের অর্থনীতি বিগত কয়েক দশকে অনেক দূর এগিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়া সহজ অর্জন নয়। কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি, নারীর কর্মসংস্থান, প্রবাসী আয় এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। এসব সাফল্যের সবচেয়ে বড় অংশীদার সাধারণ মানুষ, যাদের শ্রম ও অধ্যবসায় বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ করেছে।
কিন্তু অর্থনীতির সাফল্য শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফ প্রাক্কলন করেছে বাংলাদেশের জিডিপি ৫১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি, অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তিশ্রমকে বিবেচনায় আনলে হয়তো আরও বেশি হবে। দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ৩০০০ মার্কিন ডলার পেরিয়ে গেছে। তবে প্রবৃদ্ধি যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে; মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসে; আয়বৈষম্য কমাতে না পারে এবং মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও স্বস্তি না বাড়ায়, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। উন্নয়নের প্রকৃত পরীক্ষা হয় নাগরিকের জীবনে; পরিসংখ্যানে নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে। ব্যাংক খাতে অনিয়ম, খেলাপি ঋণের বোঝা, বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থর গতি এবং সীমিত রাজস্ব আহরণ অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে রাজস্ব সংস্কার, আর্থিক খাতে জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এই সুপারিশ নতুন নয়; বহুদিন ধরেই দেশের অর্থনীতিবিদরা একই ধরনের সংস্কারের কথা বলে আসছেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণ সংস্থা বাংলাদেশের ঋণমান নামিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
এখানেই সুশাসনের প্রশ্নটি সামনে আসে। অনেকেই সুশাসনকে কেবল রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখেন। বাস্তবে এটি অর্থনৈতিক বিষয়ও। বাজার অর্থনীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকে, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা থাকে, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং ব্যবসায়ীরা নিশ্চিত থাকেন– সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। অর্থনৈতিক আস্থা তৈরি হয় প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর; কেবল ঘোষণার ওপর নয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন বাস্তবতা। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ, নাকি আর একটু অপেক্ষা; বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিবেশ; জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির প্রতিযোগিতা– এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট হবে না। দক্ষ মানবসম্পদ, শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নীতির ধারাবাহিকতায় বিনিয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতির ইতিহাস আমাদের একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয়– যেসব দেশ দীর্ঘ মেয়াদে সফল হয়েছে, তারা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। সেখানে ব্যাংক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রাজস্ব প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে বিনিয়োগকারী আস্থা পেয়েছেন; উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত হয়েছেন এবং সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেছেন, তাদের পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য তারা পাবেন।
কবি শামসুর রাহমানের একটি মোনাজাতের খসড়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে মানুষ হয়তো প্রার্থনায় আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু স্বাধীন দেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও সুশাসনের জন্য মোনাজাত করতে না হয়। অর্থনীতির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির হার নয়; বরং রাষ্ট্র তার নাগরিকের জীবনে কতটা আস্থা সৃষ্টি করতে পারছে তার ওপর সেটা নির্ভর করবে।
বাংলাদেশের মানুষের শ্রম, মেধা ও সম্ভাবনার কোনো ঘাটতি নেই। এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেই শক্তিকে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা, যেখানে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি কেবল সেতু, মহাসড়ক বা জিডিপির পরিসংখ্যান নয়; উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি মানুষের আস্থা।
ড. এ কে এম সাহিদ রেজা: সাবেক পরিচালক, এফবিসিসিআই
- বিষয় :
- অর্থনীতি