নারায়ণগঞ্জ
এক জেলায় এত গ্যাস দুর্ঘটনা!
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১১:১৩
নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এবং গ্যাস সরবরাহ লাইনের নিঃসরণ হইতে সৃষ্ট অগ্নিদুর্ঘটনা বিষয়ে শনিবার সমকালের প্রতিবেদনে যেই চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে, উহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে গ্যাস সরবরাহ লাইনের লিকেজে এহেন অগ্নিদুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ২১৭; চলতি বৎসরের মে মাস পর্যন্ত বিস্ফোরণজনিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে ৭১টি। শুধু একটি জেলায় এত সংখ্যক দুর্ঘটনা যেই কোনো মানদণ্ডেই স্বাভাবিক হইতে পারে না। একদা শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জ গ্যাস দুর্ঘটনাপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হইল কিনা, ভাবিবার বিষয়।
প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জেই ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শহরের পশ্চিম তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে গ্যাস লাইনের ত্রুটি হইতে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে ৩৪ জন প্রাণ হারাইয়াছিলেন। স্পষ্টত এই ধরনের দুর্ঘটনা নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন যাবৎ ঘটিয়া চলিলেও উহা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাইতেছে না। বরং দুর্ভাগ্যবশত কর্তৃপক্ষসমূহ মূল কারণকে পাশ কাটাইয়া এই ধরনের অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট গৃহে বায়ু চলাচলের ঘাটতিকেই মূল কারণ হিসাবে তুলিয়া ধরেন। নিঃসন্দেহে গ্যাস নিঃসরণ করিলেও যদি তাহা কক্ষে জমিতে না পারে, তাহা হইলে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সহজ হইত। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জে ইতোপূর্বে দুর্ঘটনাকবলিত অধিকাংশ গৃহে কোনো ‘ভেন্টিলেটর’ ছিল না। এমনকি ইহার বিকল্প হিসাবে একজস্টারও থাকে না।
ভবন মালিক বা বাসিন্দাদের এহেন অসচেতনতা বা অজ্ঞতা অগ্নিকাণ্ডসমূহে যতই ভূমিকা রাখুক, তাহাতে তিতাস গ্যাসসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহের দায় হ্রাস পায় না। কারণ ভবন মালিক বা বাসিন্দাদের উক্ত বিপদ সম্পর্কে সচেতন করিবার প্রাথমিক দায়িত্বও সরকারের। উপরন্তু নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়াছে, ২০২০ সালে মসজিদে আগুন ও ২০২১ সালে হাশেম ফুডের ঘটনার পর জেলা প্রশাসন ও তিতাসের করা আলাদা তদন্ত কমিটি অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে ১৮ দফা সুপারিশ করিয়াছিল। তন্মধ্যে ছিল– তিতাসের গ্যাস সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষাপূর্বক ত্রুটি শনাক্ত ও সংস্কার করা; গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করিলে ভবনের নিরাপদ স্থানে সিলিন্ডার রাখিয়া নল দিয়া চুল্লির সহিত সংযোগ; অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা ইত্যাদি। কিন্তু সেই সুপারিশমালার কোনোটাই বাস্তবে আলোর মুখ দর্শন করে নাই।
স্মর্তব্য, গ্যাস দুর্ঘটনা নারায়ণগঞ্জেই সীমাবদ্ধ নাই। ঢাকাসহ দেশের অন্যত্র এহেন বহু ঘটনার খবর কিছুদিন পরপর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তদুপরি নারায়ণগঞ্জের ন্যায় অন্যান্য জেলা ও অঞ্চলের গ্যাস দুর্ঘটনাবলিরও অধিকাংশের শিকার দরিদ্র এবং শ্রমজীবী মানুষ। সাধারণত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল হইতে জীবিকার সন্ধানে তাহারা শিল্পাঞ্চলে পাড়ি দেন। অত্যন্ত সীমিত আয়ের এই মানুষদের সপরিবার ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করিতে হয়। তাহাদের গৃহে প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবেই ভেন্টিলেটর থাকে না। এমনকি চৌর্যবৃত্তির ভয়ে দিনের বেলায়ও দরজা-জানালা বন্ধ রাখিতে হয়। ফলে কোনো কারণে গ্যাস লিকেজ হইলে তাহা জমিয়া ঘরে ‘গ্যাস চেম্বার’ তৈরি হইতেই পারে। অসাবধানতাবশত দিয়াশলাই বা লাইটার জ্বালাইলে আগুন লাগিয়া প্রাণ যায় অনেকের।
প্রতিবেদনমতে, নারায়ণগঞ্জে তিতাসের লাইনের বৃহদাংশ গত শতাব্দীর ষাটের দশকে স্থাপিত। অধিকন্তু বিভিন্ন সময়ে উন্নয়নকার্যের খননযজ্ঞেও অনেক লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই চিত্র বিশেষত তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের আওতাধীন বহু এলাকার। তিতাসের নারায়ণগঞ্জ জোনের ডিএমডি সমকালকে জেলার কোন কোন অংশে কত টাকা ব্যয়ে ছিদ্র জরিপ ও মেরামত করার পরিকল্পনা গৃহীত হইয়াছে তাহার ফিরিস্তি দিয়াছেন। প্রায় একই বক্তব্য আমরা ২০২০ সালের বায়তুস সালাত জামে মসজিদের ঘটনার পরও শুনিয়াছিলাম। অতএব আমাদের প্রত্যাশা, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে কথায় নহে, কার্যে দেখাইতে হইবে। গ্যাস সংক্রান্ত অন্য কর্তৃপক্ষসমূহের নিকটও দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য।
- বিষয় :
- গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ
- সম্পাদকীয়