ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

ক্যাশলেস লেনদেনে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে

ক্যাশলেস লেনদেনে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে
×

সামছুর রহমান আদিল

সামছুর রহমান আদিল

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০৮

নাইরোবির জোমো কেনিয়াত্তা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই চোখে পড়ে বিশাল বিলবোর্ডে ইংরেজিতে লেখা ‘ওয়েলকাম টু এম-পেসা ন্যাশন’। আফ্রিকার এই দেশে ‘এম-পেসা নেশন’ শব্দবন্ধটি দেখে একটু খটকা লাগতে পারে। কেনিয়ায় কয়েক দিন কাটালেই বোঝা যায়, এটি নিছক বিজ্ঞাপনী স্লোগান নয়, বরং বাস্তবতা। এম-পেসা মূলত একটি মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা, অনেকটা বাংলাদেশের বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো। পার্থক্য হলো, কেনিয়ায় এটি শুধু অ্যাপ নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অংশ। হোটেল, সুপারশপ, রাস্তার পাশের ছোট দোকান, ট্যাক্সি, এমনকি গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রায় সবাই এম-পেসায় অর্থ গ্রহণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। একসময় মনে হতে থাকে, এই অ্যাপটিই যেন দেশটির অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

কেনিয়ায় ১১ দিন অবস্থানকালে মানুষের হাতে নগদ টাকা খুব কমই দেখেছি। মোবাইলে এম-পেসা থাকলেই প্রায় সব কাজ হয়ে গেছে। এই অভিজ্ঞতা মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে, একটি উন্নয়নশীল দেশ কীভাবে এত দ্রুত নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে উঠল? আর বাংলাদেশ, যেখানে মোবাইল আর্থিক সেবার গ্রাহক কোটি কোটি, সেখানে এখনও কেন নগদ অর্থই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু প্রযুক্তিতে নয়; অর্থনীতি, নীতি নির্ধারণ এবং মানুষের আচরণে লুকিয়ে আছে।

২০০৭ সালে ভোডাফোনের সহায়তায় টেলিকম কোম্পানি সাফারিকম কেনিয়ায় এম-পেসা চালু করে। শুরুতে উদ্দেশ্য ছিল সহজে টাকা পাঠানোর সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু অল্প সময়েই এটি বিল পরিশোধ, বেতন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষিপণ্য কেনাবেচা থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। সরকার, ব্যাংক, টেলিকম অপারেটর এবং ব্যবসায়ীরা সবাই একই দিকে এগিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সাধারণ মানুষও সেটিকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করেছেন। ফলে এম-পেসা শুধু প্রযুক্তি নয়, একটি জাতীয় আর্থিক অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে।

এর সুফলও গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০১৬ সালে সায়েন্স সাময়িকীতে অর্থনীতিবিদ ট্যাভনিট সুরি ও উইলিয়াম জ্যাকের গবেষণায় দেখা যায়, এম-পেসার বিস্তার কেনিয়ায় প্রায় দুই লাখ পরিবারকে চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা ও আয় বৃদ্ধিতে এর বড় ভূমিকা ছিল। মোবাইল শিল্পের বৈশ্বিক সংগঠন জিএসএমএর বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা গেছে, ডিজিটাল আর্থিক সেবা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা সহজ করেছে। তবে কেনিয়ার এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ পরিসংখ্যান নয়, মানুষের অভ্যাস।

শুধু শহরে নয়, গ্রামেও একই চিত্র। মাসাই গ্রামে প্রবেশ করতে জনপ্রতি ২০ ডলার দিতে হবে। আমাদের কাছে খুচরা ডলার ছিল না। কিন্তু এম-পেসায় পর্যাপ্ত কেনিয়ান শিলিং ছিল। গ্রামের সর্দারের ছেলে মুহূর্তেই হিসাব করে বলল, ডলারের পরিবর্তে এম-পেসায় শিলিং পাঠিয়ে দিলেই হবে। ইউরোপ ও মেক্সিকো থেকে আসা পর্যটকরাও একইভাবে মূল্য পরিশোধ করলেন। কয়েক শ বছর ধরে নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখা মাসাই জনগোষ্ঠীও ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত। শুধু প্রযুক্তি দিয়ে এটি সম্ভব হয়নি, এর জন্য সামাজিক পরিবর্তনও প্রয়োজন হয়েছে।

বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের যাত্রা নতুন নয়। বিকাশ, নগদ, রকেট, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ডভিত্তিক লেনদেন সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তঃকার্যক্ষম বা ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট ব্যবস্থা বাংলা কিউআর চালু করেছে। কিন্তু প্রযুক্তি থাকা আর মানুষের অভ্যাস বদলে যাওয়া এক বিষয় নয়। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মূল্যমানের হিসাবে দেশে এখনও প্রায় ৬৫ শতাংশ লেনদেন নগদে হয়, ডিজিটাল মাধ্যমে হয় মাত্র ৩৫ শতাংশ। বড় অঙ্কের লেনদেনে নগদের ব্যবহার আরও বেশি। অর্থাৎ আমরা ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করছি ঠিকই, কিন্তু অর্থনীতির মূল প্রবাহ এখনও নগদনির্ভর। এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ডিজিটাল লেনদেন শুধু সুবিধার বিষয় নয়, এটি অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেনের একটি নির্ভরযোগ্য রেকর্ড তৈরি হয়। বিপরীতে নগদ অর্থের ক্ষেত্রে সেই স্বচ্ছতা থাকে না। এ কারণেই বিশ্বের বহু দেশ ক্যাশলেস অর্থনীতিকে শুধু প্রযুক্তিগত রূপান্তর নয়, সুশাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখছে।

বাংলাদেশেও বাস্তবতা ভিন্ন নয়। এখনও এমন অনেক রেস্তোরাঁ, পাইকারি বাজার বা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে কেবল নগদ অর্থে বিল পরিশোধ করা যায়। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, নগদ লেনদেন ব্যবসার প্রকৃত আকার গোপন রাখার সুযোগ তৈরি করে, যেখানে ডিজিটাল লেনদেন সেই সুযোগ অনেকটাই সীমিত করে দেয়। কর ফাঁকি, অপ্রদর্শিত আয়, ঘুষ কিংবা অর্থ পাচারের মতো অপরাধে নগদ অর্থ যে বেশি সুবিধাজনক, সেটিও অস্বীকারের উপায় নেই।

বাংলাদেশ শুধু প্রযুক্তির অভাবে পিছিয়েছে তা নয়, আস্থার অভাবও ভূমিকা রাখছে। এখনও অনেক মানুষ ডিজিটাল লেনদেনে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনে করেন, এতে অতিরিক্ত খরচ বাড়বে। আবার অনেক ক্ষেত্রে করব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোও ডিজিটাল লেনদেনকে যথেষ্ট উৎসাহিত করে না। সরকারি সেবার বড় অংশেও নগদের বিকল্প এখনও বাধ্যতামূলক নয়।

কেনিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষের অভ্যাস বদলাতে শুধু প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়, নীতিগত ধারাবাহিকতাও দরকার। সরকারি সব ধরনের কর, ইউটিলিটি বিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি, ট্রাফিক জরিমানা– এগুলো ধাপে ধাপে ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়ে আসতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রণোদনা বা ফি-ছাড় দিতে হবে। কেনিয়া দেখিয়েছে, একটি মোবাইল পেমেন্ট সেবা শুধু লেনদেনের মাধ্যম নয়; এটি পুরো অর্থনীতির চরিত্র বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটতে পারে। তবে এর জন্য প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। 

সামছুর রহমান আদিল: সাংবাদিক ও যোগাযোগবিদ
[email protected]

আরও পড়ুন

×