ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

এনটিআরসিএ নাকি ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষামন্ত্রী বললেন— সিদ্ধান্ত হয়নি

এনটিআরসিএ নাকি ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষামন্ত্রী বললেন— সিদ্ধান্ত হয়নি
×

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ২৩:৩০ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ২৩:৫০

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। চাকরিপ্রত্যাশী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন এর প্রতিবাদে সরব হয়েছে। কোথাও আন্দোলনের ঘোষণা, কোথাও আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারিও এসেছে।

তবে এ নিয়ে সরকার এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সোমবার রাতে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এনটিআরসিএ ২০০৫ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এনটিআরসিএর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দরভাবে কীভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পর্যালোচনা অব্যাহত রেখেছে। ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া–সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। এ বিষয়ে কোনো অপতথ্য প্রচার না করার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ রইল।’

যে কার্যবিবরণী ঘিরে বিতর্ক
শিক্ষক নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত মূলত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সভার কার্যবিবরণী প্রকাশ্যে আসার পর। এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

১৯তম এনটিআরসিএ শিক্ষক (প্রবেশ পর্যায়) নিবন্ধন পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়ে সভার সিদ্ধান্তসংবলিত কার্যবিবরণীতে বলা হয়, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’ অনুযায়ী এনটিআরসিএ এখন থেকে শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের দায়িত্ব পালন করবে। ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করবে না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

কার্যবিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়, এনটিআরসিএর বর্তমান অচলাবস্থা কাটাতে আগের ব্যবস্থায় ফিরে গিয়ে সংস্থাটির মাধ্যমে শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। এরপর প্রত্যয়নপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়েও সভায় মতামত দেওয়া হয়।

এই কার্যবিবরণী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই মূলত নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত।

বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষকসহ প্রবেশ পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষক পদে এনটিআরসিএর পরীক্ষা ও সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ হয়ে থাকে। অন্যদিকে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও কর্মচারী পদে এতদিন ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগের ব্যবস্থা ছিল।

সম্প্রতি এসব পদেও এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট পদগুলোর লিখিত পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এ অবস্থায় এনটিআরসিএকে শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজে সীমাবদ্ধ রেখে নিয়োগের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির হাতে দেওয়ার সম্ভাবনার খবর চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

এ নিয়ে রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগাম আন্দোলনের ঘোষণা দেন এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী। সোমবার বিকেলের পর চাকরিপ্রত্যাশীদের অনেকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে পোস্ট দেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াসহ দলটির কয়েকজন নেতাও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান।

আসিফ মাহমুদ তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হলে বড় ধরনের আন্দোলনের মুখে পড়তে হবে সরকারকে। স্কুলগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেওয়া হবে না। বেকার তরুণদের জন্য কোটি কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলে উল্টো কর্মসংস্থান কেড়ে নিয়ে স্কুলগুলোকেও দলীয়করণ করতে চাচ্ছে বিএনপি সরকার।’

জামায়াতে ইসলামীও এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে। দলটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়া হলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয় প্রভাব ও ঘুষ-বাণিজ্যের পুরোনো চক্র আবার সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দলটি আরও বলেছে, বিদ্যমান নিয়োগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও জটিলতা দূর করে সেটিকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিলে অতীতের মতো অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হবে। তাই এ উদ্যোগ বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে তারা।

বিষয়টি নিয়ে সোমবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি।

অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র আন্দোলন এক বিবৃতিতে ম্যানেজিং কমিটির পরিবর্তে এনটিআরসিএকে শিক্ষক নিয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাও করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংগঠনটি।

আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ছাত্রসংগঠন ছাত্রপক্ষও পৃথক বিবৃতিতে এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছে। তাদের ভাষ্য, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে গেলে ‘ঘুষ-বাণিজ্যের পুনরুত্থান’ ঘটবে। তারা এটিকে ‘মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ ধ্বংসের পাঁয়তারা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সংগঠনটির দাবি, মেধার পরিবর্তে অর্থ ও তদবিরনির্ভর নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সংকটে পড়বে।

অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা বাড়তে থাকলে সরকার–সমর্থক ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরাও প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন পৃথক ফেসবুক পোস্টে সবাইকে গুজবনির্ভর প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

তাঁরা বলেন, ‘সবাইকে গুজবনির্ভর অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করছি। এনটিআরসিএ নিয়ে সঠিক তথ্য খুব শিগগির জানা যাবে।’

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়। রাত ৯টার দিকে তাঁর ফেসবুক পেজ ‘এহছানুল হক মিলন মিডিয়া সেল’ থেকে দেওয়া পোস্টে বলা হয়, এনটিআরসিএর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দর করার উপায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা চলছে। তবে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন

×