ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

সৌদিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশি

স্বপ্ন পূরণে বিদেশে, ফিরছেন লাশ হয়ে

স্বপ্ন পূরণে বিদেশে, ফিরছেন লাশ হয়ে
×

ছবি: সংগৃহীত

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৪:২৯

কেউ গিয়েছিলেন অর্থ আয় করে ঋণ শোধ করতে, কারও ইচ্ছা ছিল স্বপ্নের বাড়ি বানানো। কারও স্বপ্ন ছিল দেশে ফিরে ভালো পরিবারে বিয়ে করে সংসার পাতার। কেউ আবার গিয়েছিলেন সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে।

কারও ঘরে সন্তান জন্ম নিয়েছে মাত্র ১৪ দিন আগে। কেউ ফিরে বিয়ে করবেন বলে দিন গুনছিলেন দেশে ফেরার। দেশে স্বজনদের অপেক্ষা, কবে বাড়ি ফিরবে প্রিয় মানুষটি। সবার ফেরার সময় হয়েছে, কিন্তু জীবন্ত নয়, লাশ হয়ে। স্বজনদের অপেক্ষার পালা শেষ হচ্ছে তবে আনন্দ নিয়ে নয়, শোকের কান্নায়।

গত রোববার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলা ও একজনের সদর উপজেলায়, দুজনের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায় এবং আরেকজনের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায়।

রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

নিহতরা হলেন–নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের মোহন প্রামাণিক (২২), তাঁর ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫), সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) ও নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ মহল্লার শাহিন (৩৮); নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা শ্রীপুরপাড়া গ্রামের গোলাম রাব্বানীর ছেলে সাব্বির হোসেন শুভ (২৯), দিঘীরপাড় গ্রামের জাকের হোসেনের ছেলে শামীম হোসেন (৩০) এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ডাঙ্গাপাড়ার শ্যামল উদ্দিন মাঝি (৪৬)।

‘বাড়ি এসে বিয়া করমু মা’
গন্ডগোহালি গ্রামের মোহন ও সুমনের বাড়িতে এখন শুধু কান্নার শব্দ। দুই সন্তানকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা ময়না খাতুন। স্বজনরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই ছেলেদের ছবি বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ময়না খাতুন বলেন, ‘বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে, আর মেজো ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনোদিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলছিল, মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করে বিয়া করমু মা। মেয়ে-টেয়ে দেখো না, আমি ১০টা দেখে একটা বিয়ে করমু। কিন্তু আসা হলো না। কী সর্বনাশ হলো বাবা আমার।’

মায়ের সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। যে ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রী দেখার কথা ছিল, এখন তাঁরই শেষ মুখ দেখার অপেক্ষায় মা।

১৪ দিনের সন্তান বাবার অপেক্ষায়
রুবেল প্রামাণিকের বাড়ির শোক যেন আরও গভীর। ৯ বছর আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। সাড়ে ছয় বছর পর ছুটিতে বাড়ি এসে বিয়ে করেন। এরপর আবার ফিরে যান সৌদি আরব। তাঁদের ঘর আলো করে আসে কন্যাসন্তান। ছয় মাসের ছুটি কাটিয়ে মাত্র তিন মাস আগে কর্মস্থলে ফিরেছিলেন রুবেল। এর মধ্যেই জন্ম নেয় তাঁর আরেক সন্তান। সেই নবজাতকের বয়স এখন মাত্র ১৪ দিন।

রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, ‘আমার রুবেলের ৯ বছর হচ্ছে সৌদি যাওয়ার বয়স। সাড়ে ছয় বছর পরে ছুটিতে আইছিল। আসার পরে ছাওয়ালোক আবার বিয়া দিনু। বিয়া করে আবার গেলো সৌদি। যেয়ে দুই বছরকার মাথাত আলো বাড়িত। আসে ছয় মাসের ছুটি কাটে গেলো। ছয় মাস ছুটি কাটায়ে যায়ে কেবল তিন মাস হলো।’

কথা বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তাঁর। বলেন, ‘আমার তো আর দুনিয়ার বুকে কেউ থাকলো না বাবা। আমার নাতনি হছে, কেবল ১৪ দিন হচ্ছে। ১৪ দিনের ছাওয়াল থুয়ে চলে গেল।’

বাবা জানেন না, কীভাবে ১৪ দিনের শিশুকে বোঝাবেন; যার জন্য বাবা আর কখনও ফিরবেন না।

ঋণের বোঝা এখন কার কাঁধে?
উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ দেড় বছর আগে সৌদি আরব যান। বিদেশ যাওয়ার জন্য পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছিল। ফরিদের পাঠানো টাকায় চলছিল সংসার, শোধ হচ্ছিল ঋণ। স্ত্রী ও দুই বছরের মেয়েকে রেখে এখন তিনি ফিরবেন লাশ হয়ে।

ফরিদের বাবা ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। এখন ঋণ শোধ করমু ক্যামন করে আর সংসার চালামু ক্যামনে?’

পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে এখন পরিবারটির সামনে আরও বড় অনিশ্চয়তা। ছোট্ট মেয়েটি হয়তো বাবাকে খুঁজবে; কিন্তু সেই বাবা আর কোনোদিন তাকে কোলে নিতে পারবেন না।

ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু
ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় শ্রমিকেরা ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল বলে তাঁদের কাছে খবর এসেছে। দিনের বেলায় শ্রমিকেরা ঘুমাতেন এবং রাতে কাজ করতেন। তিনি বলেন, ঘুমন্ত অবস্থায় কারখানায় আগুন লাগায় হাসিবুলসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

বিএ পাস করার পর স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন হাসিবুল। চাকরি চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার ছিলেন। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় তিন বছর আগে সৌদি আরব যান তিনি। চাচার ভাষায়, পরিবারের জন্যই বিদেশে গিয়েছিল। এখন সেই পরিবারের কাছেই ফিরবে লাশ হয়ে।

শেষ দেখার অপেক্ষা
গন্ডগোহালি, উজানপৈ, ডুবাইসহ নিহতদের গ্রামগুলোতে এখন একই দৃশ্য। স্বজনদের চোখে পানি, মুখে আহাজারি। কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে আছেন। কেউ নির্বাক হয়ে বসে আছেন। আবার কেউ বারবার মোবাইল ফোনের দিকে তাকাচ্ছেন–যদি ওপার থেকে মরদেহ দেশে পাঠানোর কোনো খবর আসে।

স্বজনদের এখন আর কোনো দাবি নেই। নেই স্বপ্ন পূরণের হিসাবও। শুধু একটাই অপেক্ষা–কবে দেশে আসবে প্রিয় মানুষগুলোর মরদেহ।
কোনো মা অপেক্ষা করছেন শেষবার ছেলের মুখ দেখবেন বলে। কোনো স্ত্রী অপেক্ষা করছেন স্বামীর নিথর দেহের পাশে বসবেন বলে। কোনো বাবা অপেক্ষা করছেন সন্তানের লাশ কাঁধে নেওয়ার জন্য। আর ১৪ দিনের শিশুটি জানবে না যে বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকার কথা, সেই বাবা ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে।

শোকাহত পরিবারগুলোর কাছে প্রতিটি মুহূর্ত এখন দীর্ঘ হয়ে উঠেছে। প্রিয়জনের কণ্ঠ আর শোনা যাবে না–তবু শেষবারের মতো মুখটি দেখার আশায় দিন গুনছেন স্বজনরা।

নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত ও মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার জন্য সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

৪০ দিনের শিশুকে নিয়ে শামীমের স্ত্রীর আহাজারি
মাত্র ৪০ দিনের শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে স্বামীর স্মৃতিচারণ করতে করতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন শামীমের স্ত্রী মিতু বেগম। বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘আমার ছেলেটা বাবার মুখ চিনে উঠতে পারল না। সংসারের সুখের জন্য বিদেশে গিয়েছিল, এখন শুধু তাঁর লাশটাই দেশে ফিরবে। আমার সন্তানকে নিয়ে আমি এখন কীভাবে বাঁচব?’

নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে শামীম হোসেন (৩০)। সাত মাস আগে সৌদি আরব যান। অপর দুজন রবিউল আওয়াল হৃদয় (২৮) পাঁচ বছর আগে ও তিন বছর আগে সাব্বির হোসেন শুভ (২৯) সৌদি আরব পাড়ি জমান। অতি সাধারণ কৃষক পরিবারের এসব সন্তান মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে বিদেশ যান। এখনও তাদের সেসব ঋণ শোধ হয়নি। তাদের ব্যাংক এবং এনজিওতে ঋণ রয়েছে।

শামীমের বাবা জাকির হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলেটা সংসারের হাল ধরেছিল। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেলো। দেনা কীভাবে পরিশোধ করব?’

টিকিট কেটেও ফেরা হলো না শ্যামলের
তিন কন্যার মুখে হাসি ফোটাতে আট বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন রাজশাহীর বাগমারার শ্যামল উদ্দিন মাঝি। তবে এ সময়ের মধ্যে পরিবারের জন্য কিছুই করতে পারেননি তিনি। ঋণ করে বিদেশে গিয়ে পালিয়ে ছিলেন দীর্ঘ সময়। কিছু দিন আগে এক লাখ টাকাও নিয়েছেন মেয়ে জামাইয়ের কাছ থেকে। পরিবারের অনুরোধে আগামী শুক্রবার একবারে দেশে ফেরার জন্য বিমানের টিকিট কেনাসহ সব প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জীবিত নয় যদি ফেরার সুযোগ হয় ফিরবেন লাশ হয়ে।

শ্যামল উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনেরা আহাজারি করছেন। প্রতিবেশীরা তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। শ্যামলের স্ত্রী রশিদা খাতুন কান্নায় ভেঙে পড়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলছেন।

সংজ্ঞা ফিরতেই রশিদা খাতুন বিলাপ করে বলে ওঠেন, ‘তুমার সঙ্গে হামার কালকেই কথা হলো। তুমি বাড়িত আসবে বললে, আর রাতে তুমার মরার খবর পানু।’

প্রধানমন্ত্রীর শোক
রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সোমবার এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ মিশনকে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে দ্রুততম সময়ে নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।

জামায়াতের শোক
সৌদি আরবে আগুনে ১৬ জন বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলের পক্ষে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই শোক জানান।

(তথ্য পাঠিয়েছেন প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা)

আরও পড়ুন

×