ওবায়দুল কাদের-আরাফাতের অডিও
‘টিভিতে লাশের ছবি দেখালে সম্প্রচার স্থায়ীভাবে বন্ধ’
ওবায়দুল কাদের ও মোহাম্মদ এ আরাফাত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৩:৫৩
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাবেক সেতুমন্ত্রী, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির সাত নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্কের চতুর্থ দিনে ফোনালাপের একটি অডিও উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতকে বলতে শোনা যায়, টিভিতে লাশের ছবি দেখালে সম্প্রচার স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সোমবার অডিও ফোনালাপটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে যুক্তি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।
তিনি বলেন, ৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের এই অডিও রেকর্ডটি ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের কথোপকথনের। আজ মঙ্গলবার প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হবে।
এই অডিওতে শোনা যায়, কোনো টেলিভিশনে লাশ, সংঘাত বা মারামারির ভিডিও দেখালে তাদের ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ বা ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ ঘোষণা করে সারাজীবনের জন্য সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে ওবায়দুল কাদেরকে জানাচ্ছেন মোহাম্মদ এ আরাফাত।
নথিতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ফোনালাপটি ২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুর ২টার সময়ের। জুলাই আন্দোলন চলাকালে টেলিভিশন সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কথা বলছিলেন ওবায়দুল কাদের ও মোহাম্মদ এ আরাফাত।
ফোনালাপে ওবায়দুল কাদের প্রথমে বলেন, ‘এই যে যারা কথা শোনে না, আমি তো প্রত্যেকটা টিভি চ্যানেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’ জবাবে আরাফাত বলেন, তিনি এরই মধ্যে দুয়েকটি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছেন এবং অন্যদেরও সতর্ক করেছেন। এ সময় ওবায়দুল কাদের টেলিভিশনগুলো যাতে সংঘাতের খবর না দেয়, সে বিষয়ে জোর দেন।
তখন আরাফাত বলেন, তিনি টেলিভিশন স্টেশনগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন, সংঘাত বা মারামারির ভিডিও দেখালে তাদের ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ ঘোষণা করা হবে এবং আজীবনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে।
ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের বিষয়েও কাদেরের সঙ্গে আরাফাতের কথা হয়। ওবায়দুল কাদের পরিস্থিতি জানতে চাইলে আরাফাত জানান, কোটা আন্দোলনকারীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।
আরাফাত বলেন, ‘এক দল হলো কোটা আন্দোলনকারী স্টুডেন্ট, যাদের সাথে আমরা আলাপ করছি। আরেকটা হলো তৃতীয় পক্ষ অর্থাৎ জামায়াত-বিএনপির সন্ত্রাসীরা, যারা পোড়াচ্ছে। কারফিউ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হচ্ছে, জামায়াত-বিএনপি সন্ত্রাসী যারা পোড়াচ্ছে, তাদের বিপক্ষে। আর কোটা আন্দোলকারী ছাত্রদের সাথে আমাদের আলোচনা চলছে, আমরা সমাধানের দিকে যাচ্ছি। এই হচ্ছে আমাদের ন্যারেটিভ এখন।’
ওবায়দুল কাদের ওই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। কথোপকথনের শেষের দিকে আরাফাত বলেন, আলোচনার পর তিনি গণভবনে এসেছেন এবং একটি ব্রিফ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, তিনি বাসায় ফিরেছেন এবং সেখানে ছোটখাটো ব্রিফ করেছেন। এ সময় তিনি আহত দলীয় নেতাকর্মীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। আরাফাত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রসিকিউশনের দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলন দমনে আসামিরা ‘সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উস্কানিমূলক বক্তব্য’ দেন। কোথাও কোথাও ‘সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণেও’ আসামিরা ভূমিকা রাখেন। এতে দেশজুড়ে হত্যা ও ব্যাপক সহিংসতা হয়।
এ মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া পলাতক অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
পরে গাজী এম এইচ তামিম সংবাদিকদের বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৮ ও ২২ জুলাই চারটি টিভির সম্প্রচার কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় গণমাধ্যমগুলো স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রচার করতে পারেনি। তবে কিছু পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল সঠিকভাবে খবর প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাংগঠনিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্দোলন দমনে মাঠে নেমেছিল, এটা আমরা আদালতকে দেখিয়েছি।’