ঢাকা বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি

‘তুলে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলেই রশিতে ঝুলিয়ে পেটানো হতো’

‘তুলে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলেই রশিতে ঝুলিয়ে পেটানো হতো’
×

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ২২:২১

দশ বছর আগে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন নূরে আলম। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে সপ্তম সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।

জবানবন্দিতে ৩২ বছর বয়সী নীলফামারির বাসিন্দা ব্যবসায়ী নূরে আলম নিজের গুমজীবন নিয়ে নানা বর্ননা দেন। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে নীলফামারী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পাশাপাশি রাজনীতিও করতেন। কলেজের রসায়ন বিভাগ শাখার ছাত্রদলের সভাপতি হওয়ায় বিভিন্ন সময় মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতে হতো তাকে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার আর ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন তিনি।

ভুক্তভোগী নুরে আলম বলেন, ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল রাত দেড়টায় দিকে ঘরের দরজায় কেউ টোকা দেয়। দরজা খুলতেই অচেনা আরও পাঁচ-ছয়জনকে দেখতে পাই। তারা আমার কক্ষে ঢুকে নাম জিজ্ঞেস করেন। একপর্যায়ে আমাকে নিয়ে যান। ঘর থেকে বের করে আমার হাতে হাতকড়া লাগান তারা। ওই সময় চারটি ছাঁই রঙের মাইক্রোবাস ছিল। লোক ছিলেন ৩০-৩৫ জন। একপর্যায়ে একটি গাড়িতে তুলে চোখ বেঁধে ফেলেন একজন। পরানো হয় যমটুপিও। পরে উচ্চশব্দে গান বাজিয়ে গাড়ি চালাতে থাকেন তারা। 

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, এক-দেড় ঘণ্টা চলার পর এক জায়গায় থামিয়ে আমাকে গাড়ি থেকে বের করা হয়। দোতলায় নিয়ে একটি টুলের ওপর প্রায় ৩০ মিনিট রাখার পর পুনরায় নিচে নামিয়ে একটি গাড়িতে তোলা হয়। গাড়িটি আট-দশ ঘণ্টা চলার পর একটি জায়গায় থামিয়ে নামানো হয়। এরপর একটি সেলে ঢোকানো হয়। এরপর হাতের হাতকড়া, যমটুপি ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। ওই কক্ষে কোনো জানালা ছিল না। একটি চৌকি, একটি বালিশ, কোরআন শরীফ, জায়নামাজ ও একটি প্রস্রাবের পাত্র ছিল। কক্ষটি ৮ ফিট বাই ১১ ফিট। উচ্চতা ছিল ১৩ ফিট। মাঝেমধ্যে এক্সস্ট ফ্যান চালালেও বৈদ্যুতিক বাল্বটি ২৪ ঘণ্টাই জ্বালানো থাকতো।

ভুক্তভোগী বলেন, একদিন মাইকে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর খবরে ‘পূর্ব কাফরুল নিবাসী’ শব্দটি শুনতে পাই। এতে বুঝতে পারি পূর্ব কাফরুলের আশপাশে ক্যান্টনমেন্টের কোথাও গুম হয়ে রয়েছি। কেন ছাত্রদলের রাজনীতি করেন, শেখ হাসিনা সরকার আর ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণও জানতে চান অফিসাররা। 

জবানবন্দিতে নূরে আলম বলেন, এরপর আমার দুই হাঁটু ও উরুর ওপর বেধড়ক পেটাতে থাকেন একজন কর্মকর্তা। সেলে আরেকদিন জিজ্ঞাসাবাদ করেন একজন নারী কর্মকর্তা। তাকেও তুলে আনার কারণ জিজ্ঞেস করি। কিন্তু এ প্রশ্নে তিনিও বেশ রেগে যান। একপর্যায়ে আমার হাতের হাতকড়া খুলে দড়ি দিয়ে বাঁধেন তিনি। এরপর রশিতে ঝুলিয়ে কোমর থেকে পা পর্যন্ত বেধড়ক পেটান।

ভুক্তভোগী জানান, সেলে প্রথম কয়েকদিন তাকে ঘুমাতে দেওয়া হতো না। ঘুমালে লোহার দরজায় প্রচণ্ড শব্দ করে লিখতে বলা হতো। তারা তাকে প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন।

নূরে আলম বলেন, ২০১৬ সালের ২৬ জুন জামা-কাপড় বদলানোর পর আমার হাতে হাতকড়া পরিয়ে চোখ বেঁধে যমটুপি পরান তারা। এরপর সেল থেকে বের করে একটি গাড়িতে তুলে দেড় ঘণ্টা চলার পর একটি জায়গায় থামানো হয়। এরপর আমার হাত দুটি দরজার লোহার শিকের বাইরে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে দেন। তাদের সঙ্গে কোনো কথা বললে প্রচণ্ড মারধর করতেন। একসময় খুবই অসুস্থ হয়ে যাই। কিন্তু তারা কোনো চিকিৎসা দেননি।

কক্ষের বিবরণ দিয়ে সাক্ষী বলেন, কক্ষটির প্রস্থ ছিল চার বা পাঁচ ফুট। দৈর্ঘ্য ১২ বা ১৩ ফুট ছিল। এখানে পাশাপাশি ছিল কয়েকটি সেল। তারা সারাদিন আমাকে মাত্র দুবার সকালে-বিকালে বাথরুমে নিয়ে যেতেন। একটু সময় বেশি লাগলে তারা সেলের ভেতর নিয়ে দাঁড়িয়ে রেখে লোহার শিকের বাইরে হাত বের করে হাতকড়া লাগিয়ে সারাদিন পেটাতেন। কোনো খাবারও দিতো না। ৪০ দিন এ সেলে রাখা হয়। 

এদিন প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জবানবন্দি অসমাপ্ত রেখে আগামী ১৮ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট আসামি ১৩ জন। এ মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন তিনজন।

তারা হলেন- ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। বুধবার তারা ট্রাইব্যুনালে হাজির ছিলেন।

আরও পড়ুন

×