ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

‘আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ বক্তব্যের প্রতিবাদে ২৫ সংগঠনের যৌথ বিবৃতি

‘আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ বক্তব্যের প্রতিবাদে ২৫ সংগঠনের যৌথ বিবৃতি
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ২১:১২

‘আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘আপত্তিকর, বিভ্রান্তিকর, ইতিহাস ও বাস্তবতাবিবর্জিত’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ২৫টি আদিবাসী ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

বুধবার দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনগুলো বলেছে, বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ। বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ৫০টিরও বেশি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রথা ও জীবনধারা নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১১ আগস্ট ঢাকার একটি হোটেলে চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচটিআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী, কেউ আদিবাসী নয়।’ সাংবিধানিকভাবে সবার পরিচয় বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী নাগরিকদের একটিই মূল পরিচয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

একই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক।

সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০০৭ সালে জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র গ্রহণের সময় বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত ছিল এবং ঘোষণাপত্র ও আইএলও কনভেনশন ১৬৯ বাংলাদেশের জন্য বাধ্যতামূলক নয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

২৫ সংগঠনের নেতারা এসব বক্তব্য দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এলেও আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয়নি। বরং স্বতন্ত্র পরিচয়, ভূমি অধিকার, সাংস্কৃতিক অধিকারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা ক্রমাগত সংকট ও প্রান্তিকতার মুখোমুখি হচ্ছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে আদিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ও বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ রয়েছে। অথচ তাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা ও অধিকার নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য তাদের আরও প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র প্রসঙ্গে সংগঠনগুলো দাবি করে, ২০০৭ সালে ঘোষণাপত্রটি গ্রহণের সময় অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করে ভোট দিয়েছিল। পরে অস্ট্রেলিয়া ২০০৯ সালে, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র ২০১০ সালে এবং কানাডা ২০১৬ সালে ঘোষণাপত্রের প্রতি সমর্থন জানায়। এসব উদাহরণ বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও বিশেষ সুযোগ দিয়ে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার প্রসঙ্গেরও সমালোচনা করেছে সংগঠনগুলো। তাদের মতে, এ ধরনের চিন্তার মধ্যে আদিবাসীদের স্বকীয় সত্তা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, জীবনাচরণ ও বিশ্বাসকে নিজস্বভাবে বিকশিত করার সুযোগের পরিবর্তে তথাকথিত মূলধারার বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে একীভূত করার ইঙ্গিত রয়েছে। এটি বিএনপির ৩১ দফায় ঘোষিত ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও অসঙ্গতিপূর্ণ বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

সরকারকে একরৈখিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংগঠনগুলো বলেছে, ন্যায় ও সমতাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী বাংলাদেশ গড়তে আদিবাসীদের ভূমি, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

যৌথ বিবৃতিতে চারটি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। দাবিগুলো হলো:

১. বাংলাদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবেই সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। ২. আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ ভূমি, ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ৩. আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জ্ঞান সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ, সুরক্ষা ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ৪. ২০০৭ সালের জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন করতে হবে। 

যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে -বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফোরাম, বম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ম্রো স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ খুমী স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ খেয়াং স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস), বাংলাদেশ গারো স্টুডেন্ট ফেডারেশন (জিএসএফ), বাংলাদেশ হাজং ছাত্র সংগঠন (বাহাছাস), বাংলাদেশ মাহাতো আদিবাসী ছাত্র সংগঠন, হাজং স্টুডেন্ট কাউন্সিল (হাসুক), বাংলাদেশ গারো স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (গাসু), খাসিয়া স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ, আরফি, জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবার, ইন্ডিজিনাস স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিজিনাস স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিজিনাস স্টুডেন্টস, সাস্ট।

আরও পড়ুন

×