ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ 

জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হলো গ্রাম, ভিডিও নিয়ে সমালোচনা

জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হলো গ্রাম, ভিডিও নিয়ে সমালোচনা
×

ছবি-ভিডিও থেকে নেওয়া

রাজবাড়ী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৪২

অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে রাজবাড়ীর সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নে এক গ্রাম পুলিশ ও এক গৃহবধূকে বেঁধে নির্যাতন এবং পরে জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরানো হয়েছে। ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

গত শনিবার সকালে আলীপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ঘরে ওই গ্রাম পুলিশ ও গৃহবধূ অবস্থান করছেন। এ সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাদের দিকে তেড়ে যান। আরেকটি ভিডিওতে তাদের দুজনকে একটি ঘরের খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়।

ভিডিওতে গ্রাম পুলিশকে বলতে শোনা যায়, তিনি কোনো অন্যায় করেননি। তিনি ওই গৃহবধূর কাছে কলা বিক্রি করেছিলেন এবং কলার টাকা নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। গৃহবধূও দাবি করেন, তিনি কোনো খারাপ কাজ করেননি। ওই গ্রাম পুলিশ তার দূরসম্পর্কের আত্মীয় এবং তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই গ্রাম পুলিশ ও গৃহবধূর গলায় জুতার মালা পরিয়ে তাদের এলাকায় ঘোরানো হচ্ছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গৃহবধূর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে থাকেন। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে এবং তিনি শ্বশুরবাড়িতে থাকেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে স্থানীয় মিলন জানান, শনিবার সকাল ৮টার দিকে গৃহবধূর দেবর লাবলু ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ভিডিও করেন। এ সময় গ্রাম পুলিশ পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজন তাকে ধাওয়া করে ধরে ফেলেন। পরে তাকে বাড়িতে নিয়ে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। একইভাবে গৃহবধূকেও বেঁধে রাখা হয়।

মিলনের দাবি, খবর পেয়ে সেখানে প্রায় চার থেকে পাঁচশ মানুষ জড়ো হন। প্রায় চার ঘণ্টা পর কল্যাণপুর বাজার সমিতির সভাপতি মাসুদসহ এলাকার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি সেখানে যান। পরে ওই গ্রাম পুলিশ ও গৃহবধূকে জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরানো হয়।

জুতার মালা পরানোর সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল জানতে চাইলে মিলন বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি ওই গৃহবধূর বিরুদ্ধে আগেও একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ থাকার দাবি করেন।

এ বিষয়ে লাবলুর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি জানান, ঘটনার পর গৃহবধূর মা তাকে সেখান থেকে নিয়ে যান। তার ছেলে-মেয়ের একজনও তার সঙ্গে গেছে বলে জানান তিনি। ঘটনার পর থেকে তিনি নিজেও সমস্যার মধ্যে রয়েছেন বলে দাবি করেন।

কল্যাণপুর বাজার সমিতির সভাপতি মো. মাসুদ বলেন, ঘটনার সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। ওই বাড়ি থেকে ফোন পেয়ে সেখানে যান। তার দাবি, গ্রাম পুলিশ তার অপরাধ স্বীকার করেছিলেন। তবে জুতার মালা পরানোর সিদ্ধান্ত তিনি দেননি; এলাকাবাসী ওই সিদ্ধান্ত নেয়।

আলীপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল মজিদ খান বলেন, ঘটনার দিন তিনি এলাকায় ছিলেন না। পরে মোবাইল ফোনে বিষয়টি দেখেছেন। তাকে কেউ ঘটনাস্থলে ডাকেননি।

আলীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, ঘটনার দিন তিনি ঢাকায় ছিলেন। পরে রাজবাড়ীতে ফিরে বিষয়টি জানতে পারেন। এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ঘটনাটি ঘটিয়েছেন বলে শুনেছেন। তবে তাদের নাম বলতে রাজি হননি তিনি।

আইনজীবী অ্যাডভোকেট অভিজিৎ সোম বলেন, কেউ কোনো সামাজিক অপরাধে জড়িত থাকলে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া উচিত। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে এভাবে সামাজিকভাবে হেয় করার সুযোগ নেই। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের কর্মকাণ্ড আইনসঙ্গত হয়নি।

রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ বলেন, এ ধরনের ঘটনা আইনগতভাবে মোটেও সঠিক নয়। কেউ অপরাধ করলে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া উচিত। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগী গ্রাম পুলিশ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

আরও পড়ুন

×