ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

সিপিডির আলোচনা

দেশের জ্বালানি সংকট সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি

২০৩১ সালের মধ্যে ফুরিয়ে যেতে পারে গ্যাসের মজুত

দেশের জ্বালানি সংকট সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৩:৪৪

দেশের জ্বালানি সংকটকে শুধু সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি নয়, বরং কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া, নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বাড়তে থাকা নির্ভরতায় জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সিপিডি মনে করে, বর্তমান সংকট সামাল দিতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় জরুরি কর্মসূচি হিসেবে নেওয়া, এলএনজি আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো, জ্বালানি অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা তুলে ধরা হয়। সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। 

২০৩১ সালের মধ্যে ফুরিয়ে যেতে পারে গ্যাস
সিপিডির উপস্থাপনায় ছয় দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়, বর্তমান হারে গ্যাস ব্যবহার চলতে থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের বাকি গ্যাসের মজুত ফুরাতে পারে। 
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান না পাওয়া এবং পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশীয় গ্যাস সরবরাহ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে শিল্প, বিদ্যুৎ, সার ও অন্যান্য খাতে চাহিদা বাড়ছে। এতে চাহিদা ও সরবরাহের ফারাক দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ১২০ থেকে ১৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে বলে সিপিডির উপস্থাপনায় জানানো হয়। ১১ আগস্টের পেট্রোবাংলার তথ্য তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, পাঁচটি গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার মাত্র ৫৭ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাহিদার মাত্র ২৯ শতাংশ এবং সার কারখানাগুলোর প্রয়োজনের ৩৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে।

বাড়ছে এলএনজিনির্ভরতা
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি বাড়ছে। সিপিডির হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের ২৮.৮২ শতাংশ এসেছে আমদানি করা এলএনজি থেকে।

আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় এ নির্ভরতার ঝুঁকিও স্পষ্ট হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় কাতার থেকে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ কমে যায়। ঘাটতি পূরণে পেট্রোবাংলাকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে।

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম প্রায় ১০ ডলার থাকলেও স্পট মার্কেটে তা বেড়ে ১৫.৮৮ থেকে ১৬.৯৮ ডলারে ওঠে। এতে এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার এলএনজি ভর্তুকি প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ছয় হাজার কোটি টাকা।

তিন ধাপে পদক্ষেপ
সংকট মোকাবিলায় স্বল্প মেয়াদে এলএনজি সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় দক্ষতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি কমানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি। একই সঙ্গে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে সংস্কার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের কথা বলা হয়েছে।

মধ্য মেয়াদে এলএনজি টার্মিনাল ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ এবং জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় জরুরি অগ্রাধিকার দেওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করেছে সিপিডি।

২০২৯ সালের মধ্যে তিন নতুন টার্মিনাল
আলোচনায় জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে এবং বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করলেই হবে না, এর সঙ্গে সঞ্চালন অবকাঠামোও তৈরি করতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত গ্যাস সঞ্চালন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ জন্য সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। নতুন কূপ খননের পাশাপাশি আরও দুটি রিগ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গ্যাস সংকটের জন্য শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, কারখানা বন্ধ থাকলেও ব্যাংক ঋণের সুদ ও শ্রমিকের বেতন দিতে হয়– এই চাপ আমি বুঝি। শিল্প সচল রাখা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

শিল্পে বাড়ছে জ্বালানি খরচ
আলোচনায় শিল্প খাতের সংকট তুলে ধরেন লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। তিনি জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে তাঁর তিন কারখানায় জুন ও জুলাইয়ে অতিরিক্ত এক লাখ ৩৬ হাজার ২১৪ লিটার ডিজেল ব্যবহার করতে হয়েছে। আগের চেয়ে এ ব্যবহার বেড়েছে ৩৯০ শতাংশ।

তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের সরবরাহ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, কখন গ্যাস বা বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে– অন্তত সেই সময়সূচি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জানানো হলে উৎপাদন পরিকল্পনা করা সম্ভব।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পের উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। উচ্চমূল্যে গ্যাসের বিল দিয়েও সরবরাহ না পাওয়ায় উদ্যোক্তারা সংকটে পড়েছেন।

বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, দেশে দৈনিক প্রায় ১৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতির কারণে সাত হাজার মেগাওয়াটের বেশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনহীন অবস্থায় বসে আছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, শুধু এলএনজি আমদানি ও নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের মাধ্যমে বর্তমান সংকটের সমাধান হবে না। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি অবহেলা করায় গ্যাসের ঘাটতি এখন বড় হয়েছে। তাঁর মতে, জ্বালানির সঠিক মূল্য নির্ধারণ, চাহিদা ব্যবস্থাপনা, গ্যাসের অপচয় ও চুরি কমানোর পাশাপাশি শিল্পকে জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যেতে হবে। তিনি বলেন, আমরা সব সময় সরবরাহ বাড়ানোর সমাধান খুঁজি, কিন্তু চাহিদা ব্যবস্থাপনার কথা ভাবি না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম বলেন, বেশি দামে এলএনজি আমদানি বাড়ানো স্থায়ী সমাধান নয়। এতে গ্যাসের দাম, ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়বে। গ্যাসের অপচয় কমানো, শিল্পে জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্রসার বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানি এমন একটি পণ্য ও সেবা, যা ছাড়া অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার কারণে সংকট তৈরি হলেও এখন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে সেই সঙ্গে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও সমান্তরালে বাস্তবায়ন করতে হবে।

আরও পড়ুন

×