অভিমত
জ্বালানি সংকট অর্থনীতিকে চরম বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে
ড. মুস্তফা কে. মুজেরী
ড. মুস্তফা কে. মুজেরী
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের অর্থনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। আমাদের উন্নয়নের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া সম্ভব নয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমরা এমন এক গভীর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যা সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে থমকে দেওয়ার উপক্রম করেছে। এই সংকট কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আমাদের দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুল এবং অদূরদর্শিতার পুঞ্জীভূত ফলাফল। জ্বালানি নিরাপত্তার যে সক্ষমতা আমাদের অর্জন করার কথা ছিল, ভুল নীতির কারণে তা নিশ্চিত করতে পারিনি।
বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রধান কারণ হলো অত্যধিক আমদানি নির্ভরতা। একসময় আমরা নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ভিত্তি করে যে জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রায় পুরোপুরি আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়েছি। আমদানি নির্ভরতা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কাছে আমাদের জিম্মি করে ফেলেছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গুটিকয়েক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের তীব্র ওঠানামা এবং সরবরাহের ক্ষেত্রে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা আমাদের অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করছে। সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে আমাদের শিল্প খাতে। গ্যাসের অভাবে দেশের অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। এর ফলে জাতীয় উৎপাদনের চাকা স্থবির করে দিচ্ছে। যখন উৎপাদন ব্যাহত হয়, তখন তার প্রভাবে কেবল নির্দিষ্ট কারখানার মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে আঘাত করে। শিল্পোৎপাদন কমে যাওয়ার অর্থ হলো কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়া, যা একটি বিকাশমান অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শুধু শিল্প নয়, বাসাবাড়িতেও গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আজ বিপর্যস্ত। এটি সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতিকে এক চরম বিপদগ্রস্ত অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে যে ধরনের তৎপরতা থাকা প্রয়োজন ছিল, তার অভাব সংকটের বড় কারণ। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে শুনে আসছি, আমাদের গ্যাসের মজুত কমে আসছে, কিন্তু সে তুলনায় নতুন গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাইনি। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের ‘অফশোর’ ব্লকগুলোতে যে ধরনের অনুসন্ধান প্রয়োজন ছিল, সেখানে পিছিয়ে আছি। মনে রাখা প্রয়োজন, জ্বালানি অনুসন্ধান একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। আজ যদি ১০ জায়গায় খনন শুরু করি, তবে হয়তো একটি বা দুটি জায়গা থেকে সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। এই দীর্ঘসূত্রতার কথা মাথায় রেখে অনেক আগেই পরিকল্পনা নেওয়া উচিত ছিল। আজ আমরা সেই অদূরদর্শিতার চড়া মূল্য দিচ্ছি।
জ্বালানি খাতের এই রুগ্ণ অবস্থার পেছনে দুর্নীতি একটা বড় কারণ বলে মনে করি। এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রচণ্ড অভাব আছে। ব্যাপক দুর্নীতির কারণেই জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে। এ ছাড়া নীতিগত অস্থিতিশীলতাও একটি বড় বাধা। সরকার পরিবর্তনের সাথে বা সময়ের সাথে জ্বালানি নীতি বদলে যাওয়া কাম্য নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক ইস্যু হওয়া উচিত নয়, বরং এটি একটি জাতীয় ইস্যু।
সৌরশক্তি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর বিষয়ে দেশের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি জাতীয় ঐকমত্য থাকা জরুরি। এমন একটি জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রয়োজন, যা ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হবে না এবং যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে।
সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের এখনই দ্বিমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। স্বল্পমেয়াদি বা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে জ্বালানি আমদানির উৎসগুলো বহুমুখী করতে হবে। কেবল একটি বা দুটি উৎসের ওপর নির্ভর না করে সরবরাহ নিশ্চিত করার বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে হবে, যাতে সরবরাহ চেইন বিচ্ছিন্ন না হয়।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়া এখন সময়ের দাবি। নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যাপক বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের কাজ এখনই শুরু করতে হবে। কারণ এর সুফল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। সর্বোপরি এই খাতে পূর্ণ স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে হবে। যদি আমরা সঠিকভাবে এবং সময়মতো পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে পারি, তবেই একটি টেকসই ও নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট
- বিষয় :
- অভিমত