ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নলেয়া-ঘাঘটে মৃত্যুর মিছিল, নেই ডুবুরি

নলেয়া-ঘাঘটে মৃত্যুর মিছিল, নেই ডুবুরি
×

শাহজাহান সোহেল, সাদুল্লাপুর (গাইবান্ধা)

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

নলেয়া নদীতে বন্ধুদের সঙ্গে গোসল করতে নেমেছিল ১২ বছরের শিশু হাবিব মিয়া। সেই নদীতে নেমে সলিল সমাধি ঘটে ষষ্ঠ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর। প্রায় চার ঘণ্টা পর পানির তলদেশ থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। হাবিবের মতো এমন অবুঝ শিশুদের একের পর এক সাদুল্লাপুরের নদ-নদী-পুকুরগুলো যেন হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ।

এদিকে দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতায় বড় ঘাটতি রয়েছে। সাদুল্লাপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে নেই কোনো ডুবুরি। ফলে নদী কিংবা পুকুরে কেউ ডুবে নিখোঁজ হলে রংপুর থেকে ডুবুরি দল আনতে হয়। প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূর থেকে দলটি আসতে লেগে যায় কয়েক ঘণ্টা। ততক্ষণে নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

একের পর এক প্রাণহানি
সৌদি আরব প্রবাসী ইউনুস আলী সরকার সাদুল্লাপুর উপজেলার তরফজাহান গ্রামের আবুবকর ছিদ্দিকের ছেলে। ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন। শখের বশে বাড়ির কাছে নলেয়া নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন। এক দিন পর ৭ আগস্ট ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। ইউনুসের এমন মৃত্যুতে পরিবারসহ গোটা এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। 
এর আগে নলেয়া নদীতে বন্ধুদের সঙ্গে গোসল করতে নেমে মারা যায় হাবিব মিয়া (১২)। সে নদীসংলগ্ন তরফপাহাড়ি গ্রামের আশাদুল ইসলামের ছেলে এবং স্থানীয় তরফসাদুল্লা দাখিল মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পানিতে ডুবে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় চার ঘণ্টা পর রংপুর থেকে আসা ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল নদীর তলদেশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে।
মাদ্রাসার সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘হাবিব মিয়া মেধাবী ছাত্র ছিল। এভাবে তার মৃত্যু মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর।’
এরপর ঘাঘট নদীতে ডুবে মারা যায় খামারবাগচী গ্রামের পৃথিশ চন্দ্র (৬)। সে ওই গ্রামের ক্ষিতিশ চন্দ্রের ছেলে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, নদীতে ডুবে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২০ ঘণ্টা পর তার লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

গত ২৩ আগস্ট পানিতে ডুবে মারা যায় তরফসাদুল্লা গ্রামের আল-আমিন মিয়ার মেয়ে তাকিয়া আক্তার (৪)। ২৭ আগস্ট বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে মারা যায় ফুয়াদ মিয়া (৩)। সে উপজেলার আরাজী জামালপুর গ্রামের রুপা বেগমের ছেলে। মায়ের সঙ্গে নানার বাড়িতে থাকা শিশুটির মৃত্যুতে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া।

৭০ কিলোমিটার দূরে ডুবুরি
সাদুল্লাপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অফিসের ইনচার্জ আব্দুর রহমান বলেন, এখানে ডুবুরির কোনো পদ নেই। তাই কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রংপুর থেকে ডুবুরি দল আনতে হয়। রংপুর থেকে সাদুল্লাপুরের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। সেখান থেকে ডুবুরি দল আসতে বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
সাদুল্লাপুর পাইলট মডেল উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক খোরশেদ আলম বলেন, ‘প্রতিটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে ডুবুরি দল থাকলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার কমানো যেত। এ বিষয়ে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

পাঁচ বছরে ৬৩ শিশুর মৃত্যু
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও থানা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা মৌসুমে সাদুল্লাপুরে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারায় শিশুরা। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে পানিতে ডুবে মারা যায় ১১ শিশু। ২০২২ সালে ১৩, ২০২৩ সালে ১৪, ২০২৪ সালে ১৩ এবং ২০২৫ সালে ১২ শিশু মারা যায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৩। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত পানিতে ডুবে শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
থানার একটি সূত্র জানায়, পানিতে ডুবে মৃত্যুর পর অনেক পরিবার পুলিশি ঝামেলা এড়াতে দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা করে। ফলে সরকারি নথিতে সব মৃত্যুর তথ্য নাও আসতে পারে।

শিশুমৃত্যুর পেছনে পাঁচ কারণ
পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা দুর্ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত হয়; কিন্তু একই এলাকায় বছরের পর বছর একই ধরনের মৃত্যু ঘটতে থাকলে সেটি আর কেবল দুর্ঘটনা থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে–ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়গুলো কতটা নিরাপদ, শিশুরা কতটা নজরদারিতে আছে এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। 
পানিতে ডুবে মৃত্যু নিয়ে পুলিশের অনুসন্ধানে পাঁচটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম হাবিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ শিশুর প্রতি বয়স্কদের তত্ত্বাবধানের অভাব। এ ছাড়া শিশুদের সময়মতো সাঁতার না শেখানো, গ্রামে শিশু পরিচর্যাকেন্দ্র না থাকা, দরিদ্রতার কারণে বেখেয়ালি এবং বাড়ির নিকটবর্তী নদী-পুকুর কিংবা জলাধারে নিরাপত্তাবেষ্টনীর অভাবে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। এসব ক্ষেত্রে ইউডি মামলা নিতে হয়।’
সাদুল্লাপুরে পানিতে ডুবে মৃত্যুর পেছনে পরিবারের অসচেতনতা, শিশুদের তত্ত্বাবধানের ঘাটতি ও সাঁতার না জানার মতো ব্যক্তিগত কারণের পাশাপাশি রয়েছে বাড়ির আশপাশের জলাশয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনীর অভাব। দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধারেও রয়েছে বড় ঘাটতি। রংপুর থেকে ডুবুরি দল আসতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগায় উদ্ধার তৎপরতা শুরু হতে দেরি হয়।
নলেয়া নদীবেষ্টিত উপজেলার ইদিলপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান সরকার বলেন, ‘পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কারণ বেশির ভাগ শিশুই খেলার ছলে বাড়ির নিকটবর্তী নদী-পুকুর কিংবা জলাধারে গিয়ে মারা যাচ্ছে। সচেতনতার জন্য জনসমাগমস্থলে ক্যাম্পেইন চলছে। সামাজিক মাধ্যমেও প্রচার চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি সাঁতার না জানলে গভীর পানিতে নামতে নিষেধ করা হচ্ছে।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সুরঞ্জন কুমার সরকার বলেন, ‘পানিতে ডোবা অনেক শিশু হাসপাতালে আনা হয়। তাতে তেমন কাজ হয় না। কারণ, হাসপাতালে আনার আগে বেশির ভাগ শিশু মারা যায়। মূলত প্রাথমিক চিকিৎসা না জানা এবং পরিবারে সচেতনতার অভাবে পানিতে ডুবে বেশি মৃত্যু হচ্ছে।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শম্ভুচরণ দাস বলেন, ‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের সুরক্ষায় অভিভাবকসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সচেতনতা কার্যক্রম ও সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বিষয়টি নিয়ে ভাবা হবে।’ 
উপজেলার মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রওজাতুন জান্নাতও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিনের মধ্যে পানিতে ডুবে বেশকিছু মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি। শিশুরা এভাবে অকালে মৃত্যুর মুখে পড়বে, সেটি কারও কাম্য নয়। এ বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে।’

আরও পড়ুন

×