সরবরাহ বাড়লেও গ্যাস সংকট কাটেনি, শিল্পোৎপাদন ব্যাহত
ছবি: ফাইল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ২২:১৮ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ২২:২০
দীর্ঘ এক মাস পর গত শনিবার থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়লেও সংকট কাটেনি। বিশেষ করে শিল্পকারখানায় গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি পাম্পেও দেখা গেছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা। বাসাবাড়ির আবাসিক গ্রাহকরাও কম চাপের কারণে রান্নাবান্না নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩১ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১৬২ কোটি ৪০ লাখ এবং এলএনজি থেকে ৬৮ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট সরবরাহ হয়েছে। আজ রোববার সন্ধ্যা ৬টায় মোট সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ সরবরাহ বেড়েছে ৭ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট।
দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। সেই হিসাবে আজও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১৬২ কোটি ঘনফুট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক্সিলারেট চালু হওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে শিল্প ও সিএনজি খাতে এখনও স্বস্তি ফিরেনি।
শিল্পে কাটেনি সংকট
গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও দেশের শিল্পাঞ্চলে সংকটের তেমন উন্নতি হয়নি। কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কারখানার উৎপাদন বন্ধ বা অর্ধেকে নেমে এসেছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের এসএ স্পিনিং মিলসের বেশির ভাগ ইউনিট বন্ধ রয়েছে।
কারখানাটির ডিজিএম আজিজুল হক বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কারখানার উৎপাদন স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিতাস গ্যাসের গাজীপুর জোনের ব্যবস্থাপক (বিতরণ) সাইফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, শিল্পকারখানায় পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কয়েকদিন সময় লাগবে।
এদিকে, গ্যাসের সংকটের মধ্যে এবার ছয় মাসের জন্য কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ফুয়াং ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়া এবং কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
আজ রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে দেওয়া তথ্যে কোম্পানিটি জানায়, গত ২২ আগস্ট পরিচালনা পর্ষদের সভায় কারখানায় লে-অফ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। ওই দিন থেকেই ছয় মাসের জন্য এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বাড়লেই কারখানায় তাৎক্ষণিকভাবে স্বাভাবিক চাপ পাওয়া যায় না। সরবরাহ ব্যবস্থায় বিদ্যুতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে শিল্পে সংকট আরও দীর্ঘ হতে পারে। এতে উৎপাদন কমার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়ছে।
পাম্পে দীর্ঘ লাইন
গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে সিএনজি পাম্পে। গতকাল রাজধানীর উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, বাড্ডা, রামপুরা, মিরপুর, গাবতলী, ডেমরা, মুগদা, খিলগাঁও ও বনশ্রী এলাকায় বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক পাম্পে সরবরাহ বন্ধ থাকলেও গ্যাসের আশায় গাড়ির লাইন ছিল।
মালিবাগে এক সিএনজি অটো রিক্সা চালক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘গভীর রাতে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও দিনে পাওয়া যাচ্ছে না। দেড় ঘণ্টার মতো লাইনে দাঁড়িয়ে ১০০ টাকার গ্যাস পেয়েছি।’
অনেক ফিলিং স্টেশনে ‘গ্যাস নেই’ লেখা সাইনবোর্ড দেখা গেছে। উত্তরার বিভিন্ন পাম্পেও একই চিত্র দেখা গেছে। যেসব স্টেশন চালু ছিল, সেগুলোতেও কম চাপের কারণে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। এতে চালকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি যাত্রী পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে।
বাসাবাড়িতেও কম গ্যাসের চাপ
শিল্প ও সিএনজি খাতের পাশাপাশি গ্যাসের কম চাপের ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরাও। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় একটি সময়ে চুলায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্নাবান্নায় সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায় পরিস্থিতি বেশি খারাপ বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা। অনেক বাসায় চুলা জ্বললেও আগুনের তীব্রতা কম থাকায় রান্না শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগছে।
সংকটের জন্য যুদ্ধকে দায়ী করলেন রিজভী
চলমান জ্বালানি সংকটের জন্য বর্তমান সরকার দায়ী নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। আজ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
রিজভী বলেন, সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের জন্য সরকার বা কোনো ব্যক্তি দায়ী নন। যুদ্ধের কারণে একধরনের প্রাকৃতিক সংকট তৈরি হয়েছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটির কারণেও কয়েক দিন গ্যাসের চাপ কম ছিল বলে জানান তিনি।
রিজভীর দাবি, মহেশখালীর টার্মিনালের ত্রুটি মেরামত করা হয়েছে এবং এলএনজি কার্গো আসার পর সরবরাহও অব্যাহত রয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ বেড়েছে এবং লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
লোডশেডিং চলছে
গ্যাস সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি আজ বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও খানিকটা উন্নতি হয়েছে। পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ১২১ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে ১৪ হাজার ৬৮৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৪৩৬ মেগাওয়াট। অথচ শনিবার রাত ৮টায় চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ১১৫ মেগাওয়াট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ায় লোডশেডিং কমেছে। তবে ভারতের আদানি থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এভনও পুরোপুরি ঠিক হয়নি।
- বিষয় :
- রাজধানী
- গ্যাস সরবরাহ