ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি ভর্তুকির চাপে বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে উঠছে

জ্বালানি ভর্তুকির চাপে বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে উঠছে
×

 মেসবাহুল হক 

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৭ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

কয়েক বছর ধরে জ্বালানি তেলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়নি। এ কারণে চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। তবে কেনার খরচের চেয়ে বিক্রির দাম কম থাকার কারণে দুই মাসের লোকসান পোষাতে সম্প্রতি সরকারের কাছে সাত হাজার ৬১০ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। 

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিতে চলতি অর্থবছরের জন্য ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ ছিল ছয় হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুনের বকেয়া পরিশোধসহ চলতি অর্থবছরের মাত্র দেড় মাসেই বরাদ্দ শেষ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ খাতেও ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। বিদ্যুতে গত অর্থবছরে মাসে গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি লাগত। গত দুই মাসে প্রয়োজন হয়েছে মাসে পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

এভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বাড়তি চাপ সার্বিক বাজেট ব্যবস্থাপনাকে কঠিন করে তুলেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট কেটে যাবে– এমন প্রত্যাশা থেকে গত অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে ভর্তুকির বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় ধারণার চেয়ে অনেক বেশি দরে জ্বালানি কেনা লাগছে। বর্তমানের রাজস্ব আয়ে পরিস্থিতিতে এত ভর্তুকি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। 

এপ্রিল থেকে লোকসান দিচ্ছে বিপিসি
বিপিসি জানিয়েছে, গত এপ্রিল ও মে মাসে সংগ্রহ মূল্যের চেয়ে কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করে তাদের লোকসান দিতে হচ্ছে। ওই দুই মাসের লোকসান পোষাতে সরকারের কাছে প্রায় সাত হাজার ৬১০ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে সংস্থাটি। 

সম্প্রতি অর্থ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি এবং জ্বালানি তেল পরিবহনে অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে এখনও অস্থিতিশীলতা রয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার পুরো চাপ দেশের বাজারে না দিয়ে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হলেও প্রকৃত সংগ্রহ মূল্যের তুলনায় তা নির্ধারণ করা হয়। মে মাসেও একই সিদ্ধান্ত ছিল। 

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ১ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৭৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এরপর মাসের বাকি সময়ে প্রতিদিন গড়ে লোকসান হয়েছে ৫৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এপ্রিলে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল বিক্রি করে বিপিসির মোট লোকসান হয়েছে দুই হাজার ২৭০ কোটি টাকা। মে মাসে শুধু ডিজেল বিক্রি করেই প্রতিদিন গড়ে ১৬৪ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বিপিসির। ওই মাসে মোট লোকসানের পরিমাণ পাঁচ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা।

আইএমএফের ঋণের শর্ত অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নির্ধারণ শুরু হয়। এ ব্যবস্থায় প্রতি মাসে বিশ্ববাজারে আমদানির খরচ বিবেচনায় নিয়ে নতুন দাম ঘোষণা করা হয়। ফলে জ্বালানি তেলে সরকারের আলাদা করে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। এর আগে কয়েক বছর বিপিসি জ্বালানি তেল বিক্রি করে লাভ করায় ভর্তুকির প্রয়োজন পড়েনি। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব কারণেই চলতি বাজেটে জ্বালানি তেল খাতে কোনো ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়নি। এখন বিপিসির চাওয়া ভর্তুকি কোন খাতের বরাদ্দ থেকে দেওয়া হবে, তা নিয়ে সম্প্রতি অর্থ বিভাগে একটি বৈঠক হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনা চলছে।
অর্থ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখনও শেষ না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের মোট ভর্তুকি ব্যয় গত অর্থবছরের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। 

দেড় মাসেই এলএনজির বরাদ্দ শেষ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রয়োজনীয় এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত জুন মাসের বকেয়া এবং চলতি অর্থবছরের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে এলএনজি খাতে মোট প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। অথচ চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ছয় হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের শুরুতেই বরাদ্দের চেয়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, গত অর্থবছরের মূল বাজেটে এলএনজি খাতে ছয় হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ ছিল। কিন্তু প্রকৃত ব্যয় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে– এমন প্রত্যাশায় ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এর আগের বছরগুলোতেও এ খাতে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা করে রাখা হতো। এবার গত অর্থবছরের চেয়ে খরচ বাড়বে মনে হচ্ছে। 

বিদ্যুৎ খাতের পরিস্থিতি  
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নানামুখী অব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ খাতেও আর্থিক চাপ বাড়ছে। গত জুন ও জুলাই মাসে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়াসহ ভর্তুকি বাবদ মোট ব্যয় হয় প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। পরের অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই মাসে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে পুরো অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাড়তি ভর্তুকি সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। রাজস্ব আহরণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বাড়তি অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা বড় প্রশ্ন। এ অবস্থায় ব্যয় সংকোচনের কোনো বিকল্প নেই। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ হলো অর্থনীতির প্রাণসঞ্চারকারী। মূল্যবৃদ্ধি হোক বা ভর্তুকি দিয়ে হোক, এ খাতে সরবরাহ সচল রাখতেই হবে। তা না হলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে আমদানি-নির্ভরতা কমাতে জ্বালানি খাতের নীতিগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি।

মাহবুব আহমেদ আরও বলেন, দেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। বাপেক্সের পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানিকে সম্পৃক্ত করে উৎপাদন অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালানো যেতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর যেসব এলাকায় এখনও কার্যকর অনুসন্ধান হয়নি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। গত ১৫ বছরে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম সমকালকে বলেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। এ অবস্থায় ভর্তুকির অর্থ জোগাড়ের বদলে কীভাবে ভর্তুকি ও ঘাটতি কমানো যায়, সে কৌশল নিতে হবে। জ্বালানি খাতে সমস্যা সমাধানে জনগণকে সম্পৃক্ত করে প্রকাশ্য ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনা করতে হবে। কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট ও বিদ্যুৎ ঘাটতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী জনগণই।

তিনি বলেন, জ্বালানি সমস্যা সমাধানে বিচ্ছিন্ন মতামত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংস্কার ছাড়া অন্য কোনো পদক্ষেপে টেকসই সমাধান আসবে না। কোথায় কীভাবে ব্যয় বেড়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে ব্যয়ের প্রতিটি স্তর কমাতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি খাতকে মুনাফামুখী না করে সেবামুখী করতে হবে। সরকার জনগণের সঙ্গে ব্যবসা করবে না; জ্বালানি ও খাদ্যের মতো মৌলিক পণ্যকে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে।

শামসুল আলম আরও বলেন, বিগত সময়ে জ্বালানি খাতে ব্যাপক লুণ্ঠন হয়েছে। লুটপাট বন্ধ করতে পারলে বিদ্যুৎ খাতের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব। লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে কঠোর বিচারের আওতায় আনতে হবে। মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা বিপন্ন করার দায়ে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

 

আরও পড়ুন

×