অধিকারের সেমিনার
গুমের শিকার পরিবারের কান্না
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সেমিনারে ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা। গতকাল শনিবার সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্বজন হারানোর অপেক্ষা থামেনি। কেউ সাত বছর ধরে বাবার খোঁজে, কেউ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে স্বামীর ফেরার আশায়। কেউ আবার নিজের চোখে স্বজনকে তুলে নিয়ে যেতে দেখেও আজ শুনছেন, তিনি কোথাও নেই। গুমের শিকার এমন পরিবারগুলোর কান্না, ক্ষোভ ও উদ্বেগে গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলামটর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সেমিনার কক্ষ ভারী হয়ে ওঠে।
আজ রোববার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস সামনে রেখে গতকাল মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এই সেমিনারের আয়োজন করে। এতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রায় ২০টি পরিবার এবং গুম থেকে ফিরে আসা দুজন অংশ নেন। আলোচনায় ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা বর্তমান সরকারের সময়ও নতুন করে গুমের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে নতুন ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’-এর খসড়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁরা গুমের তদন্ত স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে দেওয়ার দাবি জানান।
বাগেরহাটের নিখোঁজ মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুনের কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব আর ক্ষোভ। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে দেখছি, কোস্টগার্ড আমার স্বামীকে নিয়া গ্যাছে। এহন তারা অস্বীকার করে।’
মুক্তা জানান, মিরাজ সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাতটার দিকে জয়মনির ঠোটা এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে সাদাপোশাকে থাকা দুজন তাঁকে কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় মিরাজের মোটরসাইকেলটি দোকানি আল-আমিনের জিম্মায় রেখে যাওয়া হয়।
তাঁর ভাষ্য, পরে ২১ এপ্রিল কোস্টগার্ড সদস্য রবিন পরিচয়ে এক ব্যক্তি মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান। এরপর কোস্টগার্ড মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে। স্বামীর সন্ধান চেয়ে মুক্তা বলেন, ‘আমি আমার স্বামীকে ফেরত চাই।’
গুমের শিকার পরিবারের সদস্য আনিশা ইসলাম ইনশাও নিজের বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান। তাঁর বাবা ইসমাইল হোসেন বাতেন ২০১৯ সালের ১৯ জুন মিরপুর-১ থেকে নিখোঁজ হন। সাত বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।
আনিশা বলেন, ‘এই সাত বছরেও বাবাকে পাইনি। দুঃখের বিষয়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়েও গুম হচ্ছে।’ ছোট্ট মাহির শেখের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বাবার ছবি হাতে মাহিরও তাঁকে খুঁজতে এসেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আনিশা বলেন, ‘আমি এ ঘটনার নিন্দা জানাই। নতুন এই আইনের নিন্দা জানাই। আমি আমার বাবাকে চাই। আমি ছোট্ট মাহির শেখের বাবাকে ফেরত চাই। আমি চাই আর কোনো গুম না হোক।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আমেনা আক্তারও। তাঁর স্বামী ফিরোজ খান বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং বরিশালের একটি ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। আমেনা জানান, ২০১২ সালের ২৪ আগস্ট র্যাব তাঁর স্বামীকে গুম করে। আজও তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সেমিনারে নতুন ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’-এর খসড়ার বিভিন্ন ধারা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বক্তারা। অধিকারের ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি পরিচালক তাসনিম ফারহানা লিখিত বক্তব্যে বলেন, গত ২৭ আগস্ট খসড়াটিতে কিছু পরিবর্তন এনে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
নতুন আইন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার এই ভুক্তভোগী আইনটিকে ‘বস্তা পচা আইন’ আখ্যা দেন।
আইনের সর্বজনীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দীন খোকন। তিনি বলেন, ‘ইলিয়াসকে (বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী) তো আমরা এখনো পাইনি। তাহলে ইলিয়াসের পরিবার গুমের যে অভিযোগ করেছিল, তা তো এখনও প্রমাণ হয়নি। তাহলে অভিযোগদাতার কি জেল হবে?’
সেমিনারের শেষ দিকে সরকারের কাছে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন তাসনিম ফারহানা। গুমের অভিযোগের তদন্ত শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর দেওয়ার পাশাপাশি তা আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখের দাবি জানানো হয়।
অধিকারের প্রোগ্রাম পরিচালক সাজ্জাদ হোসাইন সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন। এতে আরও বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নিখোঁজ অবস্থা থেকে ফিরে আসা মারুফ জামান, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের হিউম্যান রাইটস অফিসার জাহিদ হোসেন প্রমুখ।
- বিষয় :
- গুম