ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গুম প্রতিরোধ দিবস

বিচার ঘিরে আশা, নতুন ‘গুমে’ শঙ্কা

আগে গুমের শিকার ২৫১ জন এখনও নিখোঁজ

বিচার ঘিরে আশা, নতুন ‘গুমে’ শঙ্কা
×

রাজধানীর শাহবাগ থেকে ১৩ বছর আগে গুম হওয়া পারভেজ হোসেনের কন্যা আদিবা ইসলাম হৃদি এখনও খুঁজে ফেরেন বাবাকে। গতকাল শনিবার জাতীয় জাদুঘরে মায়ের ডাক আয়োজিত অনুষ্ঠানে- সমকাল

 ইন্দ্রজিৎ সরকার ও কামরুল হাসান  

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৫ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে দেড় হাজারের বেশি মানুষ গুমের শিকার হন। এর মধ্যে ২৫১ জনের খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। এ বছর গুমের মামলাগুলোর কার্যক্রমে গতি এসেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে গুমের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেড় বছরের বেশি সময়ে কোনো গুমের ঘটনা ঘটেনি। তবে গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখ নামে এক যুবককে কোস্টগার্ড পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সাড়ে চার মাসেও তাঁর সন্ধান মেলেনি। এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা।  

গুম প্রতিরোধ ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬ উপস্থাপন করা হয়। এতে গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিলটি পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে। আইনটির খসড়ায় গুমের ঘটনা তদন্তে স্বাধীন সংস্থা গঠনের বিষয়টি না থাকাসহ কিছু বিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।  

এমন পরিস্থিতিতে আজ ৩০ আগস্ট রোববার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। এবার দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আগে ভুক্তভোগী, এখনই পদক্ষেপ’। দিবসটি উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির স্বাক্ষরিত বিবৃবিতে বলা হয়, গুমের অবসান ঘটাতে শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। গুমের প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অতীতের ঘটনাগুলোর সত্য উদ্ঘাটন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে গুমের পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়ার কিছু বিধান নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। 

২৫১ জনের খোঁজ পাওয়া যায়নি
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানায়, গুমের এক হাজার ৯১৩টি অভিযোগ কমিশনে জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে এক হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ গুম হিসেবে নিশ্চিত হওয়া যায়। এর মধ্যে এক হাজার ২৮২ জন পরে ফিরে এসেছেন। ৩৬ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। বাকি ২৫১ জন এখনও নিখোঁজ। 

অবশ্য কমিশন মনে করে, নানা কারণে গুমের ঘটনার সব অভিযোগ তারা পাননি। জমা হওয়া অভিযোগ প্রকৃত ঘটনার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ। সেই হিসাবে সম্ভাব্য গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার হতে পারে। 

স্বজনের অপেক্ষার শেষ কোথায়?
২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে রাজধানীর দক্ষিণখানের হাজী মার্কেট থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক তরিকুল ইসলাম ঝন্টুকে। এর পর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। 

তরিকুল ইসলামের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম মিঠু জানান, ছেলের গুম হওয়ার ধাক্কা সইতে না পেরে তাঁর বাবা অকালে মারা যান। মায়ের অবস্থাও ভালো নয়। জায়নামাজে বসে এখনও তিনি বড় ছেলের ফিরে আসার জন্য দোয়া করেন। 

বড় ভাইকে ফিরে পেতে প্রশাসনের সব পর্যায়েই গেছেন জানিয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর ভাইয়ের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু সেটা আর হয়নি। আমাদের একটাই আবেদন, যদি ভাই জীবিত থাকে, তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আর যদি তাকে হত্যা করা হয়ে থাকে, তাহলে কঠিন শাস্তির আওতায় আনা হোক জড়িতদের।’

২০১০ সালের ২৫ জুন গুমের শিকার হন তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৬ (বর্তমান ঢাকা দক্ষিণের ২০ নম্বর) ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম। তাঁকে ইন্দিরা রোড থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর খোঁজ পায়নি পরিবার। 

চৌধুরী আলমের স্ত্রী হাসিনা চৌধুরী বলেন, ‘ওই সময় কেউ আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। সরকারের ভয়ে আত্মীয়রাও কাছে আসেনি। তখন আমার চার সন্তানের দুই সন্তানই ছোট ছিল। তাদের পড়াশোনাও অনিশ্চিত হয়ে যায়। স্বামীকে খুঁজব নাকি সন্তানদের খাবার জোগাব? এভাবেই কেটে গেছে ১৬ বছর। আমার সন্তানদের মুখে হাসি ছিল না। একজন মায়ের কাছে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কিছুই হতে পারে না।’

২০১৭ সালের ২২ আগস্ট রাজধানীর র‍্যাডিসন ব্লু হোটেলের সামনে থেকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক নির্বাহী সদস্য সৈয়দ সাদাত আহমেদকে। এর চার মাস আট দিন পর তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গণমাধ্যমের সামনে রামপুরা ব্রিজ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে ডিবি কার্যালয়ে তাঁকে আরও ২৮ দিন আটকে রাখা হয়।

সাদাত আহমেদ বলেন, গোপন স্থানে নেওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাঁকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। 

এ বিষয়ে এরই মধ্যে গুম কমিশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সাদাত আহমেদ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাও করেছেন। বিএনপির এই নেতা বলেন, আয়নাঘরের মতো কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি এ দেশে যেন ফিরে না আসে। এই নির্মমতার সাক্ষী যেন কাউকে না হতে হয়।
মিরাজ শেখ কোথায়?

মোংলার জয়মনি এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখ সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসারের খরচ মেটাতেন। তাঁর স্ত্রী মুক্তা খাতুন বলেন, ১০ এপ্রিল কোস্টগার্ডের সদস্য পরিচয়ে তাঁর স্বামীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। দুজন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি প্রথমে মিরাজকে জোর করে একটি নৌকায় তোলেন। পরে একটি স্পিডবোট আসে, সেটিতে কোস্টগার্ডের ইউনিফর্ম পরা কয়েকজনকে দেখা যায়। স্পিডবোটে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড লেখা ছিল। 

এ নিয়ে সম্প্রতি ভুক্তভোগীর পরিবার ও দুটি মানবাধিকার সংগঠনের উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। বক্তারা হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী অবিলম্বে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় মিরাজ শেখকে আদালতে হাজির করার দাবি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যমে একটি বক্তব্য পাঠায় কোস্টগার্ড। বাহিনীর গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের অপারেশনাল রেকর্ড, টহল কার্যক্রম, দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের উপস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হয়। অনুসন্ধানে কোস্টগার্ডের মিরাজ শেখকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ বা হেফাজতে নেওয়ার কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে কোস্টগার্ড দাবি করে, মিরাজ শেখ সুন্দরবনকেন্দ্রিক বনদস্যু ছোট সুমন বাহিনীর লজিস্টিক সহায়তা, মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় তিনি পরোয়ানাভুক্ত আসামি।  

এখনই সতর্ক হতে হবে: নূর খান লিটন
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে একটি গুমের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে। তবে এখনই সতর্ক না হলে ভবিষ্যতে আরও গুমের শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিগত দিনের গুমের ঘটনার মধ্যে কয়েকটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উঠেছে। এর থেকে আশা করা যায়, গুমের অপরাধের বিচার হবে। যদিও পুরো বিষয়টি সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। 

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গুম কমিশনের এই সদস্য বলেন, গুমের সব ঘটনার তদন্ত শেষ করে বিচারের ব্যবস্থা করতে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও দেখতে হবে। 

গুমের বিচারে গতি  
জানুয়ারিতে গুম কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর সম্প্রতি গুমের ঘটনার বিচারে গতি এসেছে। ২০১৫ সালে তৎকালীন বিএনপির মুখপাত্র ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে গুমের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুমের মামলায় গত ২৩ আগস্ট বিমানবাহিনীর তৎকালীন উইং কমান্ডার সাইফুর রহমান সাইফকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০১৬ সালে জামায়াত নেতা মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে গুম করে ‘আয়নাঘরে’ রাখার মামলায় অভিযুক্ত সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। ২০১৩ সালে ঢাকার বংশালে ছাত্রদল নেতা পারভেজ হোসেনসহ চারজনকে গুমের মামলার তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি নিখোঁজ ২৫১ জন ভুক্তভোগীর ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহের কাজ করছে ট্রাইব্যুনাল।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের জন্য অধিদপ্তর
গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য একটি অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ২৩ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ সংক্রান্ত সভা হয়। সেখানে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথে যারা গুম হয়েছেন, নির্মমভাবে খুন বা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন, দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কিংবা মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর জেল খেটেছেন, তাদের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ অধিদপ্তরের কাজ হবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কল্যাণ, সুচিকিৎসা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।

এদিকে গুম-খুনের শিকার এবং জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের ৭৪ জনকে চাকরি দিয়েছে সরকার। গতকাল শনিবার দুপুরে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে তাদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়। 

আরও পড়ুন

×