ব্যান্ডউইথ সংকটে বাড়তে পারে ইন্টারনেটের দাম, কমতে পারে গতি
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০২:২৪ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০২:২৭
দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ছে দ্রুত। ভিডিও দেখা, অনলাইন শিক্ষা, ক্লাউড সেবা, ডিজিটাল লেনদেন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা। এর বিপরীতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগে সিদ্ধান্তহীনতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে দেশের ইন্টারনেট খাত। এতে একদিকে ইন্টারনেটের গতি ও সেবার মান ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, অন্যদিকে বাড়তে পারে গ্রাহকের খরচ।
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সময়মতো নতুন সক্ষমতা যুক্ত করা না গেলে ২০২৮ সালেই ব্যান্ডউইথের বড় ঘাটতি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। তবে বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হলে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি পাইকারি ব্যান্ডউইথের দাম কমার সুযোগ তৈরি হবে। এতে গ্রাহক পর্যায়েও ইন্টারনেটের দাম কমানো সম্ভব হতে পারে।
সোমবার ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি) এ কর্মশালার আয়োজন করে।
বাড়ছে ব্যবহার, বাড়ছে ঝুঁকি
কর্মশালায় জানানো হয়, গত এক দশকে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বেড়েছে নজিরবিহীন হারে। ২০১৩ সালে যেখানে ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ জিবিপিএস, ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৭৬ টেরাবিটে। ২০২০ সালে ১ দশমিক ৭৮, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ২, ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৮৬ এবং ২০২৬ সালে তা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১৩ বছরে ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২৬০ গুণ।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা ১৯ দশমিক ১ টেরাবিট, ২০২৮ সালে প্রায় ২৭ টেরাবিট, ২০৩০ সালে ৫৪ টেরাবিট এবং ২০৩৫ সালে ৩০৫ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। ২০৩৬ সালে চাহিদা ৪৩২ টেরাবিটে উঠতে পারে।
ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড সেবা, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট ও শিল্পের ডিজিটালাইজেশনের কারণে এ চাহিদা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুটি ক্যাবলের ওপর নির্ভরতা
বর্তমানে আন্তর্জাতিক সংযোগের মূল ভরসা সরকারি দুটি সাবমেরিন ক্যাবল—সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। এগুলোর সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ ও ২ দশমিক ৫ টেরাবিট। বাকি ব্যান্ডউইথ আন্তর্জাতিক টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবলের (আইটিসি) মাধ্যমে আমদানি করা হয়।
কর্মশালায় বলা হয়, দুটি ক্যাবলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। ভারত ১৯টি, মালয়েশিয়া ২৩টি, থাইল্যান্ড ১২টি এবং ফিলিপাইন ১৯টি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে বাংলাদেশের সংযোগ রয়েছে মাত্র দুটি ক্যাবলে।
ফলে কোনো একটি ক্যাবলে ত্রুটি, দুর্ঘটনা বা রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সংযোগে সমস্যা হলে জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবায় বড় চাপ তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সাবমেরিন ক্যাবলে সমস্যার কারণে গ্রাহকদের ইন্টারনেট ব্যবহারে ধীরগতির অভিজ্ঞতাও হয়েছে।
সরকারের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ চালু হলেও দীর্ঘমেয়াদে সেটি যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। কারণ, সি-মি-উই-৪-এর কার্যকাল ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার কথা। ফলে নতুন সক্ষমতা যুক্ত করতে এখনই উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
বেসরকারি ক্যাবল এলে কমতে পারে দাম
কর্মশালায় বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদনকে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবিত ক্যাবলগুলো চালু হলে প্রায় ৫১ টেরাবিট অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। এতে দেশের মোট সক্ষমতা প্রায় ৬৭ টেরাবিটে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন ক্যাবল এলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি পাইকারি ব্যান্ডউইথের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। এর সুফল গ্রাহক পর্যায়েও পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।
মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, দেশে বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হবে। ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। সেবার মান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়ার পাশাপাশি ল্যাটেন্সি কমবে। নতুন সাবমেরিন ক্যাবল এলে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি নয়, আইটিসি।’
কর্মশালায় সংগঠনের সভাপতি মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইন। সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান ও মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রকল্পপ্রধান মাহমুদ শাহেদ দুটি উপস্থাপনায় সাবমেরিন ক্যাবলের ইতিহাস, ভবিষ্যৎ চাহিদা, বিনিয়োগ ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে মেটাকোর সাবকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জুনায়েদ ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম উপস্থিত ছিলেন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণ ও চালু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। তাই সংকট দেখা দেওয়ার পর উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনীয় সময়ে সক্ষমতা যুক্ত করা সম্ভব নাও হতে পারে। এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে ইন্টারনেটের গতি, সেবার মান ও গ্রাহকের খরচ—তিন ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে।
- বিষয় :
- ইন্টারনেট
- সাবমেরিন ক্যাবল