‘কণ্ঠে মোদের কুণ্ঠাবিহীন নিত্যকালের ডাক’
জাতীয় কনভেনশনে লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মিলনমেলা
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:৪১
‘কণ্ঠে মোদের কুণ্ঠাবিহীন নিত্যকালের ডাক’—এ প্রতিপাদ্য নিয়ে শুক্রবার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় অনুষ্ঠিত হলো লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জাতীয় কনভেনশন। গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত এ কনভেনশনে ৪৫টি জেলা থেকে প্রায় ৫৫০ জন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি যুক্ত হন। আরও ছিলেন শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সকালে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে জাতীয় কনভেনশন উদ্বোধন করেন লেখক ও সাংবাদিক নুরুল কবীর। এরপর সংস্কৃতিকর্মীদের শোভাযাত্রা নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপনের সভাপতিত্ব ও সদস্যসচিব মফিজুর রহমান লালটুর সঞ্চালনায় জাতীয় কনভেনশনের প্রথম অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হয় গণসংগীত, কবিতা আবৃত্তি এবং প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের পাহাড়ি নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে।
এতে বক্তব্য দেন লেখক ও সাংবাদিক নুরুল কবীর, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সংগঠক ও কমিউনিস্ট নেত্রী দীপা দত্ত, বাউলশিল্পী আবুল সরকার, লেখক রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান, নৃত্যশিল্পী সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সাজু আহমেদ, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের জাকির হোসেন, প্রগতি লেখক সংঘের দীনবন্ধু দাশ, যাত্রাশিল্পী উন্নয়ন পরিষদের এস এম লাভলু, সমাজ চিন্তা ফোরামের কামাল হোসেন বাদল, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্রের বিমল কান্তি প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে নুরুল কবীর বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের সময় আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও বাংলাদেশের যে গণতান্ত্রিক রূপান্তর দেখতে চেয়েছিলাম, তা আমাদের হাতছাড়া। ৬৯, ৯০ ও ২৪-এ পরপর একই ঘটনা ঘটেছে। পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখলে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যদি আমরা ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, তবে আমাদের কর্তব্য সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটিয়ে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর ঘটানো।’
তিনি আরও বলেন, ‘পৃথিবীতে তখনই বড় কোনো পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে শাণিত হয়, যখন ওই রাজনীতিটা জনস্বার্থপরায়ণ ও গণতন্ত্রপরায়ণ সাংস্কৃতিক পাটাতনে দাঁড়ায়। আমরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের গণতন্ত্র চাই, প্রতিনিধিত্ব চাই, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার চাই, তবে আমাদের সেই পাটাতন তৈরির কাজ আরও গভীরভাবে করতে হবে। সারা দেশ থেকে যারা এ কনভেনশনে এসেছেন, যার যার এলাকায় আপনাদের কাজকে আরও সংহত করতে হবে। আমি আপনাদের পাশে আছি। কারণ, আপনাদের ও আমার আকাঙ্ক্ষা অভিন্ন।’
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের লড়াইয়ের তাগিদে এ কনভেনশন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের লড়াইয়ের ভিত্তি তৈরি করে। সাংস্কৃতিক লড়াই সব লড়াইয়ের ভিত্তি। খেয়াল করি আর না করি, এ লড়াই চলছে। এ লড়াই শুধু মাঠে-ময়দানে হয়, তা নয়। এ লড়াই চায়ের দোকানে, পত্রিকায়, ফেসবুকে হয়। এ লড়াই চিন্তার লড়াই, চৈতন্যের লড়াই।’
তিনি বলেন, ‘‘অনেক উচ্চশিক্ষিত লোক পাবেন, যারা বলবেন, ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি ভালো, বন্দর বিদেশিদের দেওয়া উচিত, ফুলবাড়ী উন্মুক্ত কয়লা তোলা উচিত’। এসব বলা একটি দাসত্বের সংস্কৃতি। যারা জনগণের পক্ষে, আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, তারাও তো একটি সাংস্কৃতিক অংশ। ‘নারীর ঘরে থাকা উচিত, নাচ ভালো নয়, অন্য ধর্মের মানুষ খারাপ, অন্য জাতির মানুষ নিম্নমানের’—এ ধরনের চিন্তা সাম্প্রদায়িক চিন্তা। এর বিরুদ্ধে লড়াই প্রতিদিনের লড়াই। শিল্পচর্চার মধ্য দিয়েও এ লড়াই হয়। গ্রাফিতি কিংবা গানের মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সমাবেশিত হয়েছিল সৃজনশীল তৎপরতা, সংস্কৃতি এর শক্তি ছিল। অথচ এরপর একটি অংশ দাঁড়াল, যারা এই সৃষ্টির বিরুদ্ধে, শিল্পের বিরুদ্ধে, নারী ও যেকোনো জাতির বিরুদ্ধে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে। একটি গোষ্ঠী ফোন করলে পুলিশ এসে যেকোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেয়।’’
তিনি আরও বলেন, ‘গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ লেখক-শিল্পীদের দমন করেছে, তাদের সংগঠনগুলোকে ধ্বংস করেছে। গণ-অভ্যুত্থানে দেখেছি সেই সাংস্কৃতিক সংগঠনকে শক্তিশালী হতে। তাই লড়াইয়ের শক্তি আকাশ থেকে নয়, জমিন থেকেই আসে। এ লড়াইয়ে যত বৈচিত্র্যের ঐক্যকে শক্তিশালী করা হবে, ততই লিঙ্গ, শ্রেণি ও জাতিগত শোষণ দূর হবে। সংগ্রাম শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের মানুষ লড়াইয়ে জীবন দিতে কার্পণ্য করে না। আমাদের ইতিহাস প্রতিরোধের ইতিহাস, আমাদের ইতিহাস প্রত্যাশাভঙ্গেরও ইতিহাস। প্রতিরোধের ইতিহাসকে বিনির্মাণ করতে সংস্কৃতিকর্মীদের আরও সংগঠিত ও সক্রিয় হওয়া দরকার।’
বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজ বলেন, ‘আমি গান করতে পারি। এটাই আমার অস্ত্র। আমি মনে করি, সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত আমরা প্রত্যেকেই একটি পরিবার। আমরা যদি একপথে একসঙ্গে চলতে পারি, তাহলে চলার পথ সহজ হয়।’
গান গাওয়ার কারণে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে কারাগারে পাঠানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে আবুল সরকার বলেন, ‘আমি ৫ মাস জেল খেটেছি। সেখানে আমার কতটুকু দোষ ছিল, সে ব্যাখ্যা আমি না-ই দিলাম। কিন্তু আমি জেলমুক্ত হলেও আজও আমি আসলে বন্দীই আছি। আমি ওই দিন জেল থেকে মুক্তি পাব, যেদিন আমি গাইতে, নাচতে ও বুক ফুলিয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারব।’
এ সময় জেলখানায় বসে তার লেখা ‘তুমি জানো কি বন্ধু, মানো কি বন্ধু, এই মানুষ তো মানুষের জন্য’ গানটি গেয়ে শোনান আবুল সরকার।
লেখক রণজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘দুই ধরনের শিল্প-সাহিত্য বিরাজমান—প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রগতিশীল। জনগণের অমূল্য সম্পদ, জনগণ এর রক্ষক, জনগণের কথা বলে প্রগতিশীল সংস্কৃতি। প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি জনগণকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে গিয়ে চিন্তা-চেতনা ভোঁতা করে দেয়। তারা এটি করে জনগণের ওপর শোষণ ও নিপীড়ন টিকিয়ে রেখে নিজেদের ভোগবিলাস অব্যাহত রাখতে। আমাদের প্রগতিশীল সংস্কৃতিকে আরও জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে, তাদের জীবনসংগ্রাম থেকে সাহিত্যের রস সংগ্রহ করে তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।’
কবি মোহন রায়হান বলেন, ‘১৭ বছর ধরে চলে আসা স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আমরা কলম ধরেছি। আজ বর্তমান সরকার যদি বিশেষ গোষ্ঠীকে দলদাস বানাতে চায়, ক্ষমতাকে অন্যায়ভাবে হাতিয়ারে পরিণত করতে চায়, তবে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য রুখে দাঁড়াবে। আজকের কনভেনশনে এসে আশ্বস্ত হয়েছি আমরা সেই শক্তি হয়ে উঠতে পারব। এ কনভেনশন আমাকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখায়, যেখানে সাংস্কৃতিক শক্তি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করবে। এখান থেকে সেই আশা বুক ভরে নিলাম।’
এরপর মোহন রায়হান তার কবিতা থেকে পাঠ করেন, ‘যুক্তির বড় হাতিয়ার, বুকের সাহস জানো। কার্ল মার্ক্সের ভাষায় বলতে চাই, চাই সাহস, আরও সাহস, স্পর্ধিত সাহস!’
সাজু আহমেদ বলেন, ‘মাস খানেক আগে আমাদের বাসায় একটি ছোট শিশু, যে মাদ্রাসায় পড়ে, সে আমার মেয়েকে এসে বলে তার শিক্ষকেরা বলেছেন নাচ ভালো না। আমার কাছে যে মেয়েটা নাচ শিখত, তার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়ি নাচ সমর্থন করল না। কী অদ্ভুত একটি ব্যাপার! সৃষ্টিকর্তা এই পৃথিবীতে আমাদের পাঠিয়েছেন। অথচ আমারই সঙ্গে আমার মানুষকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সবার জন্যই এই বাংলাদেশ। যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে কথা বলার ও নাচ-গানের অধিকার পাব।’
দীপা দত্ত বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার যে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি করল, তাতে বাংলাদেশ আমেরিকার অধীনস্থ হলো। এরপর একটি নির্বাচিত সরকারকে পেয়ে আমরা ভেবেছিলাম এটা সবার জন্য ভালো হয়েছে। কিন্তু দেশ যেভাবে চলছে, সেখানে গণমানুষের কথাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না।’
জামশেদ আনোয়ার তপন সংস্কৃতিকর্মীদের গণ-অভ্যুত্থানে কারফিউ ভেঙে গানের মিছিল ও দ্রোহযাত্রা সংগঠিত করার বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ‘রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলেও তার শাসনব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অবসান হয়নি। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় উগ্রতা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অশুভ ছায়া আজও আমাদের সমাজকে বিপন্ন করছে। এ সংকটকালে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠকে সংগঠিত করে মানুষের মনে প্রত্যয় জাগাতে এবং একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজের পথ নির্মাণের লক্ষ্যে এ জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।’
- বিষয় :
- শিল্পী
- শিল্পকলা
- আনু মুহাম্মদ