ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ

শিক্ষক গড়বেন দেশের ভবিষ্যৎ, নিজের ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত

শিক্ষক গড়বেন দেশের ভবিষ্যৎ, নিজের ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত
×

এআই দিয়ে বানানো ছবি

 সাব্বির নেওয়াজ

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:১০

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানম ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের শিক্ষক প্রতিনিধিও। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট প্রতিষ্ঠানে মব তৈরি করে তাঁকে পদত্যাগ করানো হয়। 

ফারহানা খানম সমকালকে বলেন, ‘আমাকে চার ঘণ্টা আটকে রেখে পদত্যাগপত্রে সই নিয়েছে। সাদা কাগজে বাংলা ও ইংরেজিতে সই নেয় তারা।’ সেদিন দুই শিক্ষককে পদত্যাগে যারা বাধ্য করেছে, তাদের মধ্যে বর্তমান ছাত্রীর চেয়ে সাবেক ছাত্রী বেশি ছিল বলে জানান তিনি। ড. ফারহানাকে জোর করে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়।

ফারহানা খানমের মতো বহু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা বলেন। অথচ নিজেদের ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত। বেতন-ভাতা সীমিত, বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা নামমাত্র, পদোন্নতি ও চাকরির নিশ্চয়তাও সব ক্ষেত্রে থাকে না। মাস শেষে সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। ড. ফারহানার প্রশ্ন– ‘নিজেরাই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন না পাই, তাহলে নতুন প্রজন্মকে কী স্বপ্ন দেখাব?’

এমন প্রশ্ন শুধু একজন শিক্ষকের নয়। দেশের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নানা ধরনের আর্থিক সংকট, চাকরির অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক চাপ ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। কোথাও শিক্ষক বছরের পর বছর পদোন্নতির অপেক্ষায়, কোথাও এমপিওভুক্তির আশায়, কোথাও আবার বেতন-ভাতা পাওয়াই অনিশ্চিত। মব সন্ত্রাস ও জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাও দেশে এই পেশায় নতুন আতঙ্ক তৈরি করেছে। এ অবস্থায় আজ ৫ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য– ‘শিক্ষকদের পাশে থাকুন: পেশা সুরক্ষার ৬০ বছর, মর্যাদা উন্নত করা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনেকে বিদেশে

দেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও সংকট গভীর। ইউজিসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১৪ হাজার ৫৫৬টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১১ হাজার ১২৩ জন। অর্থাৎ, প্রায় ২৪ শতাংশ পদ শূন্য। শিক্ষকদের অনেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে আর ফিরছেন না। কেউ দেশে ফিরে কিছুদিন চাকরি করার পর আবার বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগে তৈরি হওয়া শিক্ষক ও গবেষক ধরে রাখা যাচ্ছে না। এর পেছনে বেতনবৈষম্য, গবেষণার সীমিত সুযোগ, কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত অগ্রগতির সুযোগের ঘাটতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা।

দেশে প্রভাষকের মূল বেতন নবম পে স্কেল অনুসারে ৪৪ হাজার টাকা (যা এখনও পেতে শুরু করেননি শিক্ষকরা) এবং অধ্যাপকের ৬৪ হাজার ৬০০ টাকা, যা নতুন স্কেল অনুসারে ২০২৭ সালের জুন থেকে বেড়ে এক লাখে উন্নীত হবে। অথচ ভারতে সহকারী অধ্যাপকের বেতন ৫৫ হাজার, সহযোগী অধ্যাপকের ৯০ হাজার এবং অধ্যাপকের এক লাখ ১০ হাজার টাকা। পাকিস্তানে সহকারী অধ্যাপকের মূল বেতন এক লাখ চার হাজার, সহযোগী অধ্যাপকের এক লাখ ৫৬ হাজার এবং অধ্যাপকের দুই লাখ ৩৪ হাজার টাকা। শ্রীলঙ্কায় একই পর্যায়ে বেতন যথাক্রমে– এক লাখ পাঁচ হাজার, এক লাখ ৪০ হাজার ও এক লাখ ৮৬ হাজার টাকা। নেপালে প্রভাষকের বেতন ২৮ হাজার এবং অধ্যাপকের ৬৫ হাজার টাকা। এর বাইরে বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসন, যাতায়াতসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়।

প্রাথমিকেও বেতন নিয়ে অসন্তোষ

প্রাথমিকের শিক্ষকরাও দীর্ঘদিন ধরে বেতন ও মর্যাদার প্রশ্নে অসন্তোষ জানিয়ে আসছেন। দেশে ৬৫ হাজার ৬২০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় চার লাখ শিক্ষক আছেন। তাদের মধ্যে সাড়ে তিন লাখ সহকারী শিক্ষক ১৩তম গ্রেডে বেতন-ভাতা পান। এই গ্রেডে মূল বেতন ১১ হাজার টাকা; অন্যান্য ভাতাসহ মোট বেতন প্রায় ১৯ হাজার টাকা। ২০২৭ সালের জুন থেকে তারা ২৪ হাজার টাকার স্কেলভুক্ত হবেন।

প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হলেও তারা এখনও সমপদের প্রত্যাশিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। ১১তম গ্রেডে তাদের মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা; ভাতাসহ মোট বেতন প্রায় ২১ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ ভারতে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন প্রায় ৩০ হাজার টাকা। প্রধান শিক্ষকরা ২০২৭ সালের জুন থেকে ৩২ হাজার টাকার স্কেল পাবেন।

পাঁচ লাখ এমপিও শিক্ষকও সন্তুষ্ট নন

দেশের ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি। প্রায় ৩০ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখের মতো শিক্ষক-কর্মচারীকে মূল বেতন দেয় সরকার। কিন্তু তাদের বড় অংশই বেতন-ভাতা নিয়ে সন্তুষ্ট নন। বিএডবিহীন শিক্ষকদের শুরুতে ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ টাকা মূল বেতন দেওয়া হয়। এর বাইরে বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা সামান্য।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির মহাসচিব জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা মূল বেতনের বাইরে নামমাত্র বাড়ি ভাড়া আর চিকিৎসা ভাতা পাই। ৫০ শতাংশ ঈদ বোনাস পাই, যা দুই দশকেও পরিবর্তন হয়নি। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমাদের একমাত্র দাবি।’

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক সমকালকে জানিয়েছেন, ১০০ জন শিক্ষককে দুই লাখ টাকা করে মোট দুই কোটি টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার চেষ্টাও চলছে। তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেসব সুযোগ-সুবিধা পান, শিক্ষকরাও পর্যায়ক্রমে সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন।’

আরও পড়ুন

×