জনগণের ওপর চালানো নির্যাতনের চিত্র আন্তর্জাতিক বিচার সম্মেলনে তুলে ধরলেন আইনমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:১৮ | আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:০৮
গত ১৬ বছরে দেশের জনগণের ওপর চালানো নির্যাতন-নিপীড়ন, গুম-খুনের চিত্র আন্তর্জাতিক বিচার সম্মেলনে তুলে ধরেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এ ছাড়া সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকটের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গার মতো বৈশ্বিক বোঝা বাংলাদেশ একা বহন করতে পারে না। বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্ব ও উদ্যোগের মাধ্যমে মিয়ানমারকেই এই সংকটের সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।’
তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের কুফলকে নতুন বৈশ্বিক সংকট উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, এই সংকট সমাধানে উন্নত দেশগুলোকে আন্তরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশে আরও শক্তিশালী সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে বলে আশ্বাস দেন আইনমন্ত্রী।
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে দুদিনব্যাপী (৮ ও ৯ অক্টোবর) এই ‘আন্তর্জাতিক জাস্টিস সামিট-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্বের ৭৫টি দেশের বিচারমন্ত্রী, বিচারক, আইনবিদ ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এতে অংশ নিয়েছেন। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান আজ বৃহস্পতিবার এই সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সম্মাননীয় অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ওই সময়ে এক হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষ, যারা চাকরি ও সরকারি সেবায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনেও এসব ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার বাংলাদেশে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার সরকারের মেয়াদে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত গুম এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রায় ১২ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক চ্যালেঞ্জ নয়; দেশের সম্পদ, পরিবেশ, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ একা এই বৈশ্বিক বোঝা বহন করতে পারে না এবং তার কাছ থেকে তা প্রত্যাশাও করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্বের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, নাগরিকত্ব ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্কের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আইনমন্ত্রী বলেন, সংকটের শুরু থেকেই তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। কক্সবাজারে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ানের সফর এবং তুরস্কের ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। এখন এই সংহতিকে আরও টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বৈশ্বিক আইনিব্যবস্থা বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ একদিকে বিশ্বকে সংযুক্ত করেছে এবং সেবা প্রদানকে সহজ করেছে, অন্যদিকে নতুন ধরনের বৈষম্য, বিভাজন ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু নতুন আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও অভিন্ন দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সংস্কৃতি, জ্ঞান ও সভ্যতার মিলনস্থল হিসেবে ইস্তাম্বুল এ ধরনের বৈশ্বিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত স্থান। বাংলাদেশ ও তুরস্কের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি তুরস্কের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সংহতির কথাও স্মরণ করেন।
আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্ব তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ, সীমান্ত নির্ধারণ, জ্বালানি বাজার, মেধাস্বত্ব ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তঃসীমান্ত বিরোধ দ্রুত বাড়ছে। এসব বিরোধ নিষ্পত্তিতে আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিক জাস্টিস সামিটের মতো আয়োজনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক, বিচারক, আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সম্মিলিত আলোচনা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরও ন্যায়সংগত, কার্যকর ও সাড়া-দানে সক্ষম বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থার দিকে একটি বাস্তবসম্মত পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
- বিষয় :
- আইনমন্ত্রী