ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

কারাগারে অনুশোচনা, পরে দিলেন খুনের স্বীকারোক্তি

কারাগারে অনুশোচনা, পরে  দিলেন খুনের স্বীকারোক্তি
×
×

কালু মিয়া

 ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৬

পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের পর বেশ নির্বিকারভাবেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন কালু মিয়া। অন্তত আশপাশের লোকজন কোনো সন্দেহ করেননি। তবে প্রায় দেড় বছর পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যায় সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন। কিন্তু কারাগারে গিয়ে নাকি তাঁর অনুশোচনা হয়। তাঁর ভাষ্য, নিজের হাতে খুন করা বন্ধুর আত্মা তাঁকে সত্য প্রকাশের জন্য চাপ দিতে থাকে! এর পর রিমান্ডে তিনি খুনের আদ্যোপান্ত স্বীকার করেন।

ঘটনাটি ঘটেছে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলা। গত বছরের ২০ মার্চ স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে রাসেল মিয়া নামে এক ব্যক্তির ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যায়। তদন্তে নামে স্থানীয় থানা পুলিশ। তারা রহস্যের কিনারা করতে না পারায় আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্ত করে পিবিআই।

তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর জামালপুর শাখার এসআই সুমন আহমেদ সমকালকে বলেন, নিহত রাসেল মিয়া ছিলেন হোটেলের কর্মচারী। গ্রেপ্তার কালু তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনিও দোকান কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। হত্যার সময় তাঁর সঙ্গে আরও দুই বন্ধু ছিল। তাদের নাম জানা গেছে। কালু হত্যাকাণ্ডে অন্যতম ভূমিকা রাখলেও এ ঘটনার পরিকল্পনাকারী সোহেল নামে আরেকজন। তিনি চড়া সুদে টাকা ধার দেন। আর রাসেল, কালুসহ অন্যরা তার কাছ থেকে টাকা ধার নিতেন। তাদের ছিল জুয়া খেলার অভ্যাস। ফলে টাকা খোয়াতে বেশি সময় লাগত না। এভাবে রাসেলের কাছে ৩৫ হাজার টাকা পেতেন সোহেল। সেই টাকার জন্য বারবার চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সর্বশেষ হত্যার আগের দিনও তিনি টাকা না পেলে হত্যার হুমকি দেন।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ পরিকল্পনা অনুযায়ী সোহেল তার এক বন্ধুর মাধ্যমে রাসেলকে নির্জন স্থানে ডেকে নেন। সেখানে সোহেলের নির্দেশে কালুসহ জড়িত অপর দুজন রাসেলের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। এক পর্যায়ে জোর করে তাকে মদ খাইয়ে অর্ধচেতন অবস্থায় নিয়ে যায়। এর পর রাসেলের মুখে কাপড় গুঁজে এবং পায়ুপথে মদের বোতল ঢুকিয়ে নির্যাতন করা হয়। এতে রাসেল নিস্তেজ হয়ে পড়েন। শেষে পুরো ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে রাসেলকে অচেতন অবস্থায় সরিষাবাড়ীর আরামনগর বাজারের হাফিজুর রহমানের চায়ের দোকানে নিয়ে যায়। সেখানে বাঁশের ধরনার সঙ্গে গলায় রশি দিয়ে ঝুলিয়ে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে সবাই পালিয়ে যায়।

পিবিআই সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়। তবে দ্রুতই অসংগতি ধরা পড়তে থাকে। নিহতের মা মেহেনারা খাতুন বাদী হয়ে ২১ মার্চ সরিষাবাড়ী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। থানা পুলিশ তদন্তে নেমে সন্দেহভাজন হিসেবে সোহেলকে গ্রেপ্তার করে। তবে তার কাছ থেকে কোনো তথ্য বের করা যায়নি। তিনি জামিন পেয়ে যান।
পিবিআই তদন্তের এক পর্যায়ে কালুর সংশ্লিষ্টতার আভাস পায়। গত ১১ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনিও নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন। তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। গ্রেপ্তারের ১২ দিন পর তাকে এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি মেলে। এবার কালু যেন পুরোটাই পাল্টে যাওয়া মানুষ। তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান, সব কথা স্বীকার করবেন। কারণ, কারাগারে তিনি ঘুমাতে পারছিলেন না। বারবার রাসেলের আত্মা এসে জ্বালাতন করত! প্রকৃত ঘটনা পুলিশকে বলার জন্য চাপ দিত। তাই তিনি সব খুলে বলবেন। পরে কালু আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, খুনের রহস্য পুরোটাই উদ্ঘাটন হয়েছে। তদন্ত শেষ পর্যায়ে। চলছে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়ার প্রস্তুতি। শনাক্ত হওয়া দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে। সোহেল অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার আগ পর্যন্ত জামিনে আছেন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক কারবারসহ নানা অভিযোগে ১৫টি মামলা রয়েছে।

আরও পড়ুন

×